বিবাহবিচ্ছেদের পর স্বামী-স্ত্রী নতুন করে সংসার শুরু করলেও তাদের সন্তানদের বয়ে বেড়াতে হত পুরোনো পরিচয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা আইনি প্রাচীর এবার ভেঙে দিল কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মা দ্বিতীয় বিয়ে করলে, সন্তানের জন্মনিবন্ধনে জন্মদাতা বাবার নামের পাশাপাশি বা পরিবর্তে সৎবাবার নাম ও নতুন পদবি ব্যবহার করা যাবে।
একটি মামলার প্রেক্ষিতে যুগান্তকারী এই রায় দিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরী।
হাইকোর্ট সূত্রে জানা যায় মামলার আবেদনকারী পূর্ব বর্ধমানের এক নারী ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে ওই জেলারই শুভঙ্কর কর্মকারকে বিয়ে করেন। তাদের একটি পুত্রসন্তান হয়। পরে দাম্পত্য সম্পর্কে ভাঙন ধরে এবং ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
এরপর ২০২২ সালের মার্চে মহিলা রাজেশ ঘোষ নামে একজনকে বিয়ে করেন। শিশুটি মায়ের সঙ্গে তার বর্তমান স্বামীর কাছেই থাকছিল। সৎবাবাও তাকে নিজের সন্তান হিসেবে মেনে নেন। কিন্তু জন্মনিবন্ধনে জন্মদাতা বাবার নাম থাকায় স্কুলে ভর্তির সময় সমস্যা তৈরি হয়। পূর্ব বর্ধমান পুরসভা নাম বদলাতে আপত্তি জানালে মামলা গড়ায় কলকাতা হাইকোর্টে।
মামলাটি প্রথম হাইকোর্টে আসে ২০২৫–এর সেপ্টেম্বরে। পরবর্তীতে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জন্মদাতা বাবাকে মামলার বিষয়ে জানানো হয়। শুনানি চলাকালীন শিশুটির জন্মদাতা বাবাও আদালতে উপস্থিত হয়ে জানান, নাম পরিবর্তনের এই আইনি প্রক্রিয়ায় তার কোনো আপত্তি নেই। চলতি বছরের জুলাইয়ে বর্তমান স্বামীর সঙ্গে আবেদনকারীর বিয়ের শংসাপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়। শিশুটির সঙ্গে চেম্বারে কথা বলেন বিচারপতি।
এরপরেই বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরী, তার পর্যবেক্ষণে জানায়, এ ধরনের সংবেদনশীল ও ব্যক্তিগত বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ‘হাইপার টেকনিক্যাল’ বা অতিরিক্ত কঠোর হওয়ার প্রয়োজন নেই। বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই নথি সংশোধন হওয়া উচিত।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে সমাজ। তাই সন্তানের জন্মের শংসাপত্রে জন্মদাতা বাবার নাম থাকতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বিশেষ পরিস্থিতিতে সন্তানের ‘সৎবাবা’র নাম ও পদবি জন্মের নথিতে যুক্ত করা যেতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের ‘আকেলা ললিতা’ মামলার রায় এবং ১৯৬৯ সালের জন্ম-মৃত্যু আইনের ১৫ নম্বর ধারা উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলে, ‘সমাজ এগিয়েছে, রেজিস্টারে জন্মদাতা বাবার নাম ধরে রাখা এখন আর জরুরি নয়।’
তবে হাইকোর্টের বক্তব্য, এই নামের বদল হতে হবে শিশুর ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’-এর কথা মাথায় রেখে। আদালতের আরও নির্দেশ, জন্মের পুরোনো শংসাপত্রের নম্বর ও ইস্যুর তারিখসহ প্রয়োজনীয় তথ্য নতুন নথিতে উল্লেখ করতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে নিজের পরিচয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকবে ওই সন্তানের।