তুরস্কের ১০৪তম বিজয় দিবস আজ (৩০ আগস্ট)। ১৯২২ সালের ৩০ আগস্ট দুমলুপিনারের সেই যুদ্ধ দেশটির ইতিহাসে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। দখল ও বিভক্তির মুখে থাকা একটি ভূখণ্ডকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়ে যায় ওই বিজয়, যার ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় তুরস্ক প্রজাতন্ত্র।
১৯২২ সালের ৩০ আগস্ট পশ্চিম আনাতোলিয়ায় গ্রিক বাহিনীর অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয় তুর্কি বাহিনী। এর মধ্য দিয়ে তুরস্কের স্বাধীনতাযুদ্ধের শেষ পর্যায়ের পথ খুলে যায়। পরে দখলদার বাহিনী প্রত্যাহার করে এবং ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় তুরস্ক প্রজাতন্ত্র।
বিজয় দিবস উপলক্ষে দেশজুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও জনসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। এসব আয়োজনে তুরস্কের জাতির পিতা মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক ও সেই যুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনাদের স্মরণ করা হচ্ছে।
একই দিনে তুর্কি সশস্ত্র বাহিনী দিবসও পালন করা হয়। ফলে ঐতিহাসিক বিজয়ের সঙ্গে দেশটির সামরিক বাহিনীর ভূমিকাও দিনটির উদযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই তুরস্কের দখল শুরু হয়। উসমানীয় সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর মিত্রবাহিনী ইস্তাম্বুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরাজিত সাম্রাজ্যকে ভাগ করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আনাতোলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকাও দখল করে নেয় বিজয়ী শক্তিগুলো।
১৯১৯ সালের মে মাসে মিত্রশক্তির সমর্থনে গ্রিক সেনারা ইজমিরে অবতরণ করে এবং আনাতোলিয়ার অভ্যন্তরের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। এরই মধ্যে উসমানীয় ভূখণ্ড ভাগ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল।
এর বিরুদ্ধে আনাতোলিয়ায় যে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, তার মূল বক্তব্য ছিল—এই ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ ইউরোপের কোনো রাজধানীতে বসে নির্ধারণ করা যাবে না; সেখানে বসবাসকারী জনগণই নিজেদের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে। পরবর্তী তিন বছরে বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ গড়ে উঠে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীতে পরিণত হয়।
১৯২২ সালের আগস্টে তুর্কি বাহিনী পরিস্থিতি পাল্টে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। ২৬ আগস্ট তারা ‘গ্রেট অফেন্সিভ’ বা মহা অভিযান শুরু করে। দ্রুত গ্রিক বাহিনীর প্রতিরক্ষা ভেঙে দিয়ে পরদিন আফিয়নকারাহিসার দখল করে নেয় তারা। গ্রিক সেনারা পিছু হটে দুমলুপিনারের দিকে চলে যায়।
৩০ আগস্ট দুমলুপিনারে তুর্কি বাহিনী গ্রিক সেনাবাহিনীর মূল অংশকে ঘিরে ফেলে এবং পরাজিত করে। ইতিহাসে এই যুদ্ধ ‘কমান্ডার-ইন-চিফের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত।
এরপর তুর্কি বাহিনী পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ৯ সেপ্টেম্বর তারা ইজমিরে পৌঁছে শহরটি পুনর্দখল করে—যে শহর থেকেই গ্রিক আগ্রাসন শুরু হয়েছিল।
বিজয় থেকে প্রজাতন্ত্র
দুমলুপিনারের গুরুত্ব শুধু একটি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই বিজয়ের ফলে আনাতোলিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথে তুর্কি জাতীয় আন্দোলনের সামনে থাকা শেষ বড় সামরিক বাধাটিও দূর হয়ে যায়। এরপর অক্টোবরে স্বাক্ষরিত হয় মুদানিয়া যুদ্ধবিরতি। পরে শুরু হয় লুজান চুক্তি নিয়ে আলোচনা। এর ধারাবাহিকতায় ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় তুরস্ক প্রজাতন্ত্র।
অর্থাৎ দুমলুপিনারের যুদ্ধের সামরিক বিজয়ই পরবর্তী সময়ে একটি নতুন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও আইনি ভিত্তি তৈরির পথ করে দেয়।
তুরস্কের বর্তমান নেতৃত্বও ৩০ আগস্টের গুরুত্বকে এভাবেই দেখে। দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান দিনটিকে জাতির পুনরুত্থানের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তুরস্ক তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে।
এখনো কেন গুরুত্বপূর্ণ ৩০ আগস্ট
১৯২২ সালে দখলদারিত্বের অবসান হলেও সেই সময়ের বাস্তব উপলব্ধি—সার্বভৌমত্ব ধরে রাখতে হলে সেটিকে রক্ষা করতে হয়—পরবর্তী এক শতাব্দী ধরে তুরস্কের রাষ্ট্র গঠনের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
একসময় অস্ত্রের জন্য বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল তুরস্ক এখন নিজস্ব সামরিক সরঞ্জামের ৮৫ শতাংশের বেশি উৎপাদন করে। ড্রোন, নৌযান থেকে শুরু করে সাঁজোয়া যান—বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম দেশটিতে তৈরি হচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ খাতের রপ্তানি ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
এই সক্ষমতা তুরস্ককে সক্রিয় সেনাসদস্যের সংখ্যার দিক থেকে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি হিসেবে অবস্থান শক্ত করতে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে জোটের বাইরেও দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের অংশীদারত্ব বাড়ছে।
চলতি আগস্টেও এর উদাহরণ দেখা গেছে। তুরস্ক সৌদি আরবের সঙ্গে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, যেখানে পাকিস্তানও যুক্ত রয়েছে। চুক্তিটির মূল লক্ষ্য আঞ্চলিক পর্যায়ে সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার করা।
তবে ১৯২২ সালের দুমলুপিনারে লড়াই করা সেনাদের কাছে এসব ভবিষ্যৎ ছিল অজানা। তাদের সামনে ছিল আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন—আনাতোলিয়া আদৌ তাদের নিজেদের থাকবে কি না।
সেই প্রশ্নের যে উত্তর তারা যুদ্ধক্ষেত্রে দিয়েছিলেন, তার ধারাবাহিকতাতেই পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠে তুরস্ক প্রজাতন্ত্র। গত এক শতাব্দীতে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প ও কৌশলগত সক্ষমতার যে বিস্তার ঘটেছে, তার ঐতিহাসিক শিকড়ও খুঁজে পাওয়া যায় ১৯২২ সালের আগস্টের শেষ দিনগুলোর সেই যুদ্ধে।
আজকের ৩০ আগস্ট তাই শুধু একটি সামরিক বিজয়ের স্মরণ নয়; এটি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার জন্য তুরস্কের দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রতীক। শত বছর পেরিয়েও দুমলুপিনারের বিজয় দেশটির জাতীয় পরিচয় ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে আছে।