Image description

একসময় একের পর এক শহর দখল করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে কোণঠাসা করে রেখেছিল প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো। এখন বদলে গেছে সেই চিত্র। বিমান হামলা, নতুন সেনা নিয়োগ এবং চীনের সমর্থনে শক্তিশালী হয়ে উঠছে দেশটির সামরিক শাসকগোষ্ঠী জান্তা।

বাহিনীটি এখন পুনর্দখল করছে হারানো এলাকা। এতে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো থেকে পিছু হটছে প্রতিরোধ বাহিনী। তবে কোনো লক্ষণ নেই যুদ্ধ থামার। বরং আরও দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে মিয়ানমার।

চিন রাজ্যে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আরও তিনটি শহর হাতছাড়া হয় প্রতিরোধ বাহিনীর। মে মাসের শেষ দিকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দাবি করে, রাজ্যটির পুরো উত্তরাঞ্চল এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে।

বিদ্রোহী চিন ব্রাদারহুডের সদস্য সালাই উইলিয়াম চিন বলেছেন, ‘ফালাম শহর দখলের ঘটনা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা দিয়েছে। একটি শহর দখল করা আর সেটি ধরে রাখা একেবারেই ভিন্ন চ্যালেঞ্জ।’

তার মতে, কোনো এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে জনবল, রসদ ও প্রশাসনিক সক্ষমতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আকাশপথে বারবার হামলা মোকাবিলার সক্ষমতাও থাকতে হয়।

তবে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন সালাই উইলিয়াম চিন। আল-জাজিরাকে তিনি বলেছেন, প্রতিটি শহর স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে পারছেন কি না, শুধু তা দিয়ে সাফল্য বিচার করা উচিত নয়। যেখানে সামরিক বাহিনীর বিমানশক্তির বড় সুবিধা আছে, সেখানে দ্রুতগতির যুদ্ধকৌশল বেশি কার্যকর হতে পারে। এখন মূল লক্ষ্য হলো নিজেদের বাহিনীকে টিকিয়ে রাখা। পাশাপাশি বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখা।

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পথে মিয়ানমার

প্রতিরোধ বাহিনীর এই পিছু হটা মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই বিভিন্ন মিলিশিয়া ও জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন জান্তার বিরুদ্ধে লড়ছে। তবে তাদের এই জোট এখন আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে।

২০২৩ ও ২০২৪ সালে সমন্বিত অভিযান চালায় প্রতিরোধ বাহিনী। তারা সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে কয়েক ডজন শহর দখল করেছিল। কিন্তু সেই সাফল্য এখন অনেকটাই ম্লান। দখলে থাকা শহরগুলো থেকেও ধীরে ধীরে পিছু হটতে হচ্ছে তাদের।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতির এই পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক বাহিনীর ব্যাপক সেনা নিয়োগ, বিমান হামলা এবং চীনের সমর্থন।

বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগের মাধ্যমে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাদের জনবল বাড়িয়েছে। একই সময়ে বিমান হামলা চালিয়ে প্রতিরোধ বাহিনী ও তাদের সমর্থকদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে তারা।

অন্যদিকে সামরিক বাহিনী ও কয়েকটি শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করেছে চীন। পাশাপাশি বিরোধী কয়েকটি গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতেও ভূমিকা রেখেছে বেইজিং।

আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি) প্রকল্পের বিশ্লেষক সু মোনের মতে, সামরিক বাহিনী বিরোধীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে না পারলেও পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে। আগামী মাসগুলোতে দেশটিতে মানবিক সংকট আরও বাড়তে পারে।

পাঁচ বছর ধরে চলছে যুদ্ধ

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে এই যুদ্ধ শুরু হয়। নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়নের পর তরুণদের একটি অংশ অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। তারা ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস’ বা পিডিএফ নামে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তোলে।

দেশটির সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করা শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠনগুলোও তাদের সহযোগিতা করে। এসব সংগঠনের কয়েকটি ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই করে আসছে।

এসিএলইডির হিসাবে, এই সংঘাতে নিহতের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, প্রায় ৩৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দেশটির প্রতি তিনজনের একজনের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।

চলতি বছরের শুরুতে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করেন। বড় বিরোধী দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। দেশের অনেক এলাকায় ভোট দেওয়া সম্ভব হয়নি। কোথাও ভোট বর্জনও হয়েছে।

এরপর এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন মিন অং হ্লাইং। এর মধ্য দিয়ে সেনাপ্রধান থেকে নেপিডোর নামমাত্র বেসামরিক সরকারের প্রধান হন তিনি।

মিন অং হ্লাইং এখন চিনসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সশস্ত্র বিরোধীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চান বলে দাবি করছেন। তবে লড়াই এখনো থামেনি।

কৌশলগত শহরগুলো দখলে নিচ্ছে জান্তা

চিন, কাচিন, কারেন ও রাখাইন রাজ্যে চলতি বছর নতুন করে অভিযান শুরু করেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী।

স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএসপি-মিয়ানমারের তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর সামরিক বাহিনী যে ১০১টি শহর হারিয়েছিল, এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২২টি পুনর্দখল করেছে। অর্থাৎ হারানো ভূখণ্ডের প্রায় ৯ শতাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

তবে পুনর্দখল করা এসব এলাকার কৌশলগত গুরুত্ব অনেক। এসব অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে মধ্য মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সামরিক বাহিনীর প্রধান ঘাঁটিগুলোও মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত।

এসিএলইডির সু মোনের মতে, শহরগুলো পুনর্দখলের ফলে অনেক প্রতিরোধ গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও রসদ সরবরাহের সক্ষমতা ব্যাহত হয়েছে। এসব এলাকায় জান্তা এখনো পুরোপুরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারলেও সামরিক সাফল্য প্রতিরোধ বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় দুর্বল করেছে।

ফলে বড় আকারের সমন্বিত অভিযান থেকে সরে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে এখন অনেকটাই প্রতিরক্ষামূলক গেরিলা কৌশলে যেতে হচ্ছে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অবশ্য এসব সাফল্যকে বড় করে প্রচার করছে। চলতি মাসে ব্যাংককে দেওয়া এক বক্তব্যে মিন অং হ্লাইং বলেছেন, মিয়ানমার গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও বিভিন্ন এলাকায় অভিযান শেষে সেনাদের বিজয়ী প্রত্যাবর্তনের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে।

ব্যাংককভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যান্থনি ডেভিস বলেছেন, সামরিক বাহিনীর ব্যাপক সেনা নিয়োগ এবং চীনের সমর্থন পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তার হিসাবে, ২০২৪ সাল থেকে বাধ্যতামূলক নিয়োগের মাধ্যমে প্রায় দেড় লাখ সেনা সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ ইউনিটে যুক্ত হয়েছে। তাদের অনেকের প্রশিক্ষণ সীমিত হলেও সংখ্যায় বেশি হওয়ায় সামরিক বাহিনী ধীরে ধীরে এগোতে পারছে।

চীনের চাপে মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি এবং তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির মতো দুটি শক্তিশালী বিরোধী বাহিনী যুদ্ধ থেকে সরে গেছে। এতে অন্য এলাকায় সেনা পাঠানোর সুযোগ পেয়েছে জান্তা।

এ ছাড়া বেইজিং ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মির ওপরও চাপ দিয়েছে, যাতে তারা বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করে। এর ফলে দেশজুড়ে গোলাবারুদের সংকট আরও বেড়েছে।

ডেভিস বলেছেন, যুদ্ধের শুরু থেকেই সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো তাদের প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিমানশক্তি। এর মাধ্যমে তারা একদিকে সেনাদের রসদ সরবরাহ করছে, অন্যদিকে বিরোধী বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে।

নজরদারি ও হামলার কাজে ড্রোনের ব্যবহার বাড়ায় বিভিন্ন সামরিক ইউনিটের মধ্যে উন্নত সমন্বয়ও জান্তার সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

বিমান হামলায় বাড়ছে বেসামরিক প্রাণহানি

বিমান হামলার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। মিয়ানমার ইন্টারনেট প্রজেক্টের হিসাবে, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দেশটিতে ৫২০টি বিমান হামলা হয়েছে। এসব হামলা ৮৭টি টাউনশিপে আঘাত হেনেছে। এতে অন্তত ৩১৪ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪১ জন শিশু।

সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে চিন রাজ্য। সেখানে ১২২টি বিমান হামলা হয়েছে। এরপর সাগাইংয়ে ১০১টি এবং রাখাইনে ৯৮টি হামলা চালানো হয়েছে।

এশিয়া হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লেবার অ্যাডভোকেটসের পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেছেন, সামরিক বাহিনীর বিমান আধিপত্য মোকাবিলা করতে না পারায় প্রতিরোধ বাহিনীর লড়াইয়ের গতি কমে গেছে।

আল-জাজিরাকে তিনি বলেছেন, বিমান হামলায় পিডিএফসহ অন্যান্য প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্যদের মনোবল ভেঙে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্রোহীদের সমর্থনকারী বেসামরিক মানুষও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ছেন।

তবে সামরিকবিরোধী গোষ্ঠীগুলো এখনো মনে করছে, যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি।

নির্বাসনে থাকা অধিকারকর্মী থিনজার শুনলেই ই বলেছেন, বিরোধী নেটওয়ার্কগুলো এখনো সংগঠকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং জনসমর্থন গড়ে তুলছে।

তার ভাষ্য, ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যেও তারা প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার সাহস ধরে রেখেছেন। মিয়ানমারের মানুষও সেই চেতনা ধরে রেখেছে এবং লড়াই চালিয়ে যাবে।

চিন রাজ্যের সালাই উইলিয়াম চিনও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়। তিনি বলেছেন, তাদের আরও পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখনই তা প্রকাশ্যে জানানোর সময় হয়নি। বিমানশক্তি যুদ্ধের ফলাফল স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে, এমনটা তিনি মনে করেন না। এটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও যুদ্ধের কৌশল বদলাচ্ছে।

প্রতিরোধ বাহিনীগুলোও নিজেদের কৌশল শিখছে, বদলাচ্ছে এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

সূত্র: আলজাজিরা