Image description

নেপালে ভারী বৃষ্টি না হওয়া সত্ত্বেও হঠাৎ আকস্মিক বন্যায় অন্তত ১০০ জন নিহত ও ৫৭৯ জন নিখোঁজ হয়েছেন। উজানে ভূকম্পন ও তুষারধসে নদীর গতিপথ আটকে যাওয়ায় এই বিপর্যয় ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বুধবার (২৬ আগস্ট) নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলার সিয়াপ্রু বেসি ও তিমুর এলাকায় আকস্মিক এ বন্যা আঘাত হানে। প্রবল স্রোতে কয়েকটি গ্রাম, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ও উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে।

 

‘তুষারধস থেকেই আকস্মিক বন্যা’

নেপালের ভোতে কোশি নদীতে আকস্মিক বন্যার পেছনে একটি হিমালয় পর্বতের তুষারধসের ভূমিকা থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, তুষারধসের কারণে লহেন্দে নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে যায়। এতে পানি জমে একপর্যায়ে হঠাৎ নিচের দিকে প্রবল স্রোতে নেমে আসে।

কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও জলবায়ু গবেষক রিজান ভক্ত কায়াস্থ স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কান্তিপুরকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নেপাল ও চীনের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনা এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এই ধারণা করা হচ্ছে।

কায়াস্থ বলেন, নেপালের দিক থেকে একটি তুষারধস লহেন্দে নদীতে পড়ে নদীর গতিপথ আটকে দেয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময় তিব্বতের দিকে একটি ভূমিকম্পও হয়েছিল।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তিব্বত এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। এর কেন্দ্র ছিল বিখ্যাত পর্যটন এলাকা গোসাইকুণ্ড হ্রদ থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।

তবে বন্যার পেছনে কোনো হিমবাহের হ্রদ ফেটে যাওয়ার ঘটনা ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কায়াস্থ বলেন, বিষয়টি নিশ্চিত হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। কারণ, ওই এলাকায় অতীতে হিমবাহের হ্রদ ফেটে আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটেছে।

২০২৫ সালের ৮ জুলাইও ভোতেকোশি নদীতে একই ধরনের বন্যা হয়েছিল। তখন জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছিল, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে রাসুয়া এলাকায় লহেন্দে নদীর একটি হিমবাহের হ্রদ ফেটে যাওয়ায় বন্যা হয়েছিল। সেন্টিনেল স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করেও একই তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।

এবারের বন্যা নিয়েও তুষারধসের পাশাপাশি হিমবাহের হ্রদ ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন কায়াস্থ। তিনি বলেন, ওই এলাকায় বেশ কয়েকটি বড় হিমবাহের হ্রদ রয়েছে। গত বছরও লহেন্দে নদীর গতিপথ আটকে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।

বন্যার কারণ হিসেবে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা অবশ্য নাকচ করেছেন কায়াস্থ। তার মতে, বন্যার পানি যেভাবে হঠাৎ প্রবল স্রোতে নেমে এসেছে, তাতে উজানে কোথাও পানি আটকে যাওয়ার পর তা একসঙ্গে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনাই বেশি।

 

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র শান্তি মহাতও জানিয়েছেন, একটি তুষারধসের কারণে নদীর গতিপথ আটকে যাওয়ার প্রাথমিক তথ্য তারা পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি) চীনের বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য নিয়ে তাদের জানিয়েছে।

শান্তি মহাত বলেন, এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে আইসিআইএমওডি যে তথ্য পেয়েছে, তা তাদের সঙ্গে শেয়ার করেছে। এটি প্রাথমিক মূল্যায়ন। এই মুহূর্তে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরে বন্যার প্রকৃত কারণ আরও স্পষ্ট হবে।

নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগও জানিয়েছে, নেপাল বা তিব্বতের কোথাও কোনো হিমবাহের হ্রদ ফেটে গিয়ে থাকতে পারে। তবে রাসুয়া এলাকায় মঙ্গলবার ও বুধবার ভারী বৃষ্টি হয়নি। বুধবারও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল না।

এদিকে, নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, বিভিন্ন জেলা থেকে ১০০টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ৫৭৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

দেশটির পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ২৮টি দেশের ৪৬৬ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। আর নেপালের রয়েছেন ১১৩ জন। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ৫৪ জন যুক্তরাষ্ট্রের এবং ৩৩ জন যুক্তরাজ্যের নাগরিক।

পুলিশ জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চলছে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হওয়ায় নিখোঁজ ও মৃতের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে।

 

সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট ও বিবিসি