নেপালে বুধবারের (২৬ আগস্ট) প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যার পেছনে একটি বিশাল হিমবাহের অংশ ভেঙে পাহাড় থেকে নিচে ধসে পড়ার ঘটনা ভূমিকা রেখে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন ভূতত্ত্ববিদ ও হিমবাহবিজ্ঞানীরা। এই ঘটনাকে বলা হয় ‘আইস অ্যাভাল্যাঞ্চ’ বা বরফধস।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরির ভূতত্ত্ববিদ ড্যানিয়েল শুগার স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বলেন, ওই এলাকার একটি হিমবাহের বিশাল অংশ প্রায় পরিষ্কারভাবে ভেঙে যায়। এরপর সেটি প্রায় এক কিলোমিটারেরও বেশি খাড়া পথ বেয়ে নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ে।
তার ভাষায়, নিচের অংশের দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে, যেন সেখানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছে। চারদিকে ছড়িয়ে ছিল ভেঙে চূর্ণ হয়ে যাওয়া হিমবাহের অংশ।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বরফধসই বন্যার একমাত্র কারণ ছিল- এ সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো সম্ভব নয়। নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে বুধবার সকালে নদী উপত্যকায় বন্যার পানি ছড়িয়ে পড়ার পর শত শত মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা তাপমাত্রা হিমবাহের ধসকে ত্বরান্বিত করে থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। তবে সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে আরও তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
শুগারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় দুই হাজার ফুট চওড়া একটি বিশাল বরফখণ্ড বুধবার হিমবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে সেটি প্রায় চার হাজার ফুট নিচে উপত্যকার দিকে ধসে পড়ে। সঙ্গে নেমে আসে বরফ ও পানির বিপুল স্রোত।
স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ডান্ডির হিমবাহবিজ্ঞানী সাইমন কুক বলেন, পাহাড়ের এত উঁচুতে জমে থাকা বিশাল বরফখণ্ডে বিপুল সম্ভাব্য শক্তি সঞ্চিত থাকে। সেটি ভেঙে নিচে পড়লে প্রচণ্ড আঘাতে বরফ চূর্ণ হয়ে দ্রুতগতির বিপজ্জনক বরফ-পানির স্রোতে পরিণত হয়। তার কথায়, ধসে পড়া বরফ কার্যত চূর্ণ হয়ে পানিতে পরিণত হয়।
বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ বলছে, বরফ ও পানির এই প্রবাহ উপত্যকা ধরে উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলের সীমান্তবর্তী ভোতেকোশি নদীর দিকে যায়।
সাইমন কুক বলেন, এই ঘটনা ভারতের উত্তরাখণ্ডে ২০২১ সালে ঘটে যাওয়া একটি ভয়াবহ ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। সে সময় হিমালয়ের একটি হিমবাহ ভেঙে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়েছিল। ওই দুর্যোগে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়।
ফ্রান্সের ইউনিভার্সিতে গ্রেনোবল আল্পসের ভূ-আকৃতিবিজ্ঞানী ক্রিস্টেন কুক জানান, স্থানীয় ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৮টা ৪০ মিনিটে ওই এলাকায় একটি বিশাল ভর হঠাৎ পাহাড়ের নিচের দিকে নেমে যায়। এর পরপরই শনাক্ত হয় একটি ‘ফ্লো সিগন্যাল’, যা আকস্মিক বন্যার ইঙ্গিত দেয়।
তার মতে, ঘটনার শুরুতে পাওয়া সংকেতটি বেশ শক্তিশালী ছিল। তবে সেটি ভূমিকম্পের মতো মনে হয়নি। এলাকার ভৌগোলিক পরিস্থিতি ও স্যাটেলাইট ছবির সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণা, এটি সম্ভবত একটি শিলা-বরফধস, যা নিচের দিকে নেমে গিয়ে প্রবল স্রোতে রূপ নেয়।
একই সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার কম্পন রেকর্ড করে। বিজ্ঞানীরা এখনো তথ্য বিশ্লেষণ করছেন- ভূপৃষ্ঠের ওপর সংঘটিত এই বিশাল বরফধসের শক্তিই ওই কম্পনের কারণ ছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে।
পূর্ণাঙ্গ আবহাওয়া তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে শুগার জানান, স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ঘটনার আগের দিন ওই এলাকায় বরফের আবরণ দ্রুত কমে গিয়েছিল। এটি উষ্ণ তাপমাত্রার ইঙ্গিত দেয়। উষ্ণতার কারণে হিমবাহের বরফ গলে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং সেটিই বরফধসের অন্যতম কারণ হয়ে থাকতে পারে।
তবে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় সর্বশেষ স্যাটেলাইট ছবি সম্পূর্ণভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বন্যার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা আগামী কয়েক দিনে আরও পরিষ্কার হতে পারে।
শুগার আরও বলেন, বন্যার পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, সেটিও এখনই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন ভিডিওতে পানির যে বিপুল প্রবাহ দেখা গেছে, তা সাম্প্রতিক অন্যান্য হিমবাহজনিত দুর্যোগের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
তার মতে, এত বিপুল পরিমাণ পানি দেখে মনে হচ্ছে, এই বিপর্যয়ের পেছনে বরফধসের পাশাপাশি অন্য কোনো কারণও কাজ করে থাকতে পারে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস