ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করতে বিভিন্ন দেশকে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সোমবার এই সতর্কতা জারি করে। অন্যথায় ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসন এই পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে তুলে ধরলেও এখন পর্যন্ত ইরানের মিত্র কোনো দেশের ওপর নতুন করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরোপ করেনি। এমনকি কোন কোন দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বা কখন এসব নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি ওয়াশিংটন।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ছয় মাসের কাছাকাছি পৌঁছানোর সময়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ইরানের বৈশ্বিক আর্থিক যোগাযোগের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবার ‘অর্থনৈতিক আক্রমণ’ শুরু করছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সোমবার ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। তবে ইরানের তেল বাণিজ্যে সহায়তা করছে বলে সন্দেহভাজন চীনা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এই তালিকায় রাখা হয়নি।
নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত তুলে ধরে এক সংবাদ সম্মেলনে বেসেন্ট বলেন, ‘আমি কেন হুট করে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চাইব? আমরা মনে করি, মানুষকে প্রস্তুতির সময় দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাদের জানা উচিত, এই পদক্ষেপ খুব দ্রুত এগোবে এবং আমরা যে গুরুতর, সেটিও তাদের বুঝতে হবে।’
চীন কয়েক বছর ধরে ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। ইরানের তেল কেনাবেচা বন্ধে ওয়াশিংটন চীনের ওপর চাপ বাড়ালেও এখন পর্যন্ত চীনা ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে বিরত রয়েছে।
চীনা কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বেসেন্ট বলেন, কোনো দেশই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে নয়।
তিনি বলেন, ‘যদি তারা লেনদেনে সহায়তা করে এবং এমন ব্যবস্থার অংশ হয়, যা ইরানের তেলকে অর্থে পরিণত করে এবং দমন-পীড়নে ব্যবহার করতে সহায়তা করে, তাহলে তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে।’
এদিকে আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ওয়াশিংটনে ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে চীনা ব্যাংকের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে গত নভেম্বরে হওয়া চুক্তি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ওই চুক্তির আওতায় চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বিরল খনিজের সরবরাহ চালু রাখা এবং মার্কিন শুল্ক সীমিত রাখার বিষয় উল্লেখ ছিল।
অন্যদিকে মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নিষেধাজ্ঞায় চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে ফ্রান্সের একটি রান্নার তেল শোধনাগারও রয়েছে।
বেসেন্ট বলেন, ‘ইরানের অর্থনীতির পাঁচটি খাতে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার আওতা বাড়ানো হচ্ছে। এসব খাত হলো ডিজিটাল সম্পদ, স্বর্ণ, প্রযুক্তি, বিমান চলাচল ও জাহাজ চলাচল।’
সপ্তাহের শেষ নাগাদ একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টি তিনি আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করেননি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক নিষেধাজ্ঞা সমন্বয়ক ড্যানিয়েল ফ্রাইড বলেন, ঘোষণাটি প্রত্যাশিত প্রচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি। তবে সামরিক সংঘাত পুনরায় শুরু করার চেয়ে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করাই ভালো। তার মতে, তেহরানের বিরুদ্ধে এই চাপ কার্যকর হতে সময় লাগবে। এ জন্য ধৈর্য প্রয়োজন হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনকে সহযোগিতা নিশ্চিত করতে কিছু ছাড়ও দিতে হতে পারে।
ফ্রাইড বলেন, ‘আপনাকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্মতি নিতে হবে এবং তারা কী চায়, সেটিও শুনতে হবে। আপনাকে স্থির থাকতে হবে।’
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পথে। এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। যদিও বড় ধরনের যুদ্ধ এখন অনেকটাই কমেছে, তবে কূটনৈতিকভাবে সমাধানের প্রচেষ্টা থমকে আছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও কাঁচামাল পরিবহন এখনও বন্ধ থাকায় জ্বালানি বাজারে চাপ অব্যাহত রয়েছে।
সবশেষ রয়টার্স-ইপসোস জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাত্র ৩৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক তার কার্যক্রম অনুমোদন করছেন। তবে ট্রাম্প বলছেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নেওয়া প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক দশক ধরে ইরানের সঙ্গে বৈরী কূটনৈতিক সম্পর্কের জেরে দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে। এসব নিষেধাজ্ঞার বড় অংশই দেশটির তেল আয় কমানো, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ বন্ধ করা এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন বন্ধ করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডলারের মাধ্যমে পরিচালিত আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। তবে ইরান দ্রুত নতুন ভুয়া প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সংস্থা ও জাহাজের নতুন নিবন্ধন তৈরি করে এসব নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের তেল কেনা স্বাধীন চীনা ছোট তেল শোধনাগারগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের তেল পরিবহনে ব্যবহৃত ‘গোপন বহরের’ জাহাজগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ অবরোধ দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি করেছে।
রয়টার্স গত শুক্রবার জানায়, এই অবরোধের কারণে চীনা ক্রেতাদের কাছে ইরানের অপরিশোধিত তেল বিক্রির প্রস্তাব কমেছে। ফলে চীনের ওপর দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কিছুটা কম হতে পারে।
চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অনির্দিষ্টকাল এই নৌ অবরোধ চালিয়ে যেতে পারে। এর ফলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকতে পারে, যা নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াতে পারে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর ২০২৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইরান-সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞার আওতায় এক হাজারের বেশি ব্যক্তি, জাহাজ ও বিমান এসেছে।
সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের গোপন তেল পরিবহন বহর, জাহাজের বিমা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, অস্ত্র সংগ্রহ নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল লেনদেন প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা। এসব পদক্ষেপে ইরানের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দ করা হয়েছে।
বেসেন্ট ইরানের ব্যাংক মেল্লির বিষয়েও কথা বলেন। ব্যাংকটি এখনও ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শাখা পরিচালনা করছে। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক মেল্লির প্রতিটি শাখা বন্ধ করে অচল করে দিতে হবে।’