স্কুলের দরজা বন্ধ। কাজের পথও সব আটকে গেছে। এমনকি চিকিৎসা নিতে গেলেও অনেক বাধা। নিজের সংসার থেকে বেরিয়ে আসার অধিকারও এখন সংকুচিত। তালিবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পর আফগান নারীদের জীবন যেন ছোট হয়ে আসা এক বৃত্তে বন্দি। শিক্ষা থেকে কর্মক্ষেত্র, বিয়ে থেকে বিচ্ছেদ, চিকিৎসা থেকে প্রকাশ্যে কথা বলা- জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন শুধু নিষেধের ছায়া।
২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তালিবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে। তারপর থেকেই নারী ও মেয়েদের উপর একের পর এক নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জনজীবনে নারীদের অংশগ্রহণও এখন খুব সীমিত। এর ফলে একটি প্রজন্মের মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন অনেক বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা শুধু শিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রেই থেমে নেই। শুক্রবার দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এমন এক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যা নারীদের স্বাধীনতাকে প্রায় শেষ করে দিয়েছে।
এমনকি বিয়ের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব খারাপ বলে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বিয়ের ন্যূনতম বয়স নিয়ে আগের আইনি সুরক্ষাগুলো এখন আর নেই। ফলে মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছনোকেই মাপকাঠি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। এর ফলে গরিব পরিবারগুলোর ওপর অল্পবয়সি মেয়েদের বিয়ের বিনিময়ে টাকা বা যৌতুক নেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
সংসারের ভেতরেও নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ‘সংশোধনমূলক প্রহার’ এর মতো ধারণা দিয়ে স্বামীর হাতে স্ত্রীর ওপর শারীরিক নির্যাতন করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার পাওয়া এখন অনেক কঠিন। এমনকি নির্যাতিত নারীদের জন্য থাকা অনেক আশ্রয়কেন্দ্রও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে অত্যাচার থেকে বাঁচতে চাইলেও অনেক আফগান নারীর সামনে নিরাপদ আশ্রয়ের কোনো পথ থাকে না।
চিকিৎসাক্ষেত্রেও এখন বড় সংকট তৈরি হয়েছে। নারী চিকিৎসকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আবার পুরুষ চিকিৎসকের কাছে নারীদের চিকিৎসা নেওয়ার ওপরও অনেক বাধা আছে। ফলে অসুস্থ নারীরা অনেক বিপাকে পড়ছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মেয়েদের উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ থাকায় ভবিষ্যতে নারী চিকিৎসকের সংখ্যা আরও কমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই সবকিছুর প্রভাব নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে নথিভুক্ত আত্মহত্যা এবং আত্মহত্যার চেষ্টার ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই নারী ও কিশোরীদের মধ্যে। এই সংখ্যাটি আফগানিস্তানের পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝিয়ে দেয়।
তবুও এই অন্ধকারের মধ্যেও লড়াইয়ের আলো এখনো নিভে যায়নি। তালিবানের নিষেধ সত্ত্বেও নারীরা এখন গোপনে মেয়েদের পড়াশোনা শেখাচ্ছেন। ছদ্মনামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা জানানো হচ্ছে এবং প্রতিবাদে রাস্তায় নামার মতো নানা পথ বেছে নিচ্ছেন আফগান নারীরা। চলতি বছরের জুনে হেরাতে তারই বিরল প্রকাশ্য ছবি দেখা যায়। নারী ও পুরুষেরা শিক্ষা, কাজ ও স্বাধীনতার দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। নিরাপত্তাবাহিনীর দমন, গ্রেফতার এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও সেই প্রতিবাদ দেখিয়ে দিয়েছে যে, নিষেধের দেওয়াল যত উঁচুই হোক, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে পুরোপুরি বন্দি করা যায় না।