মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বদলে যাচ্ছে দ্রুত। স্বাধীন ফিলিস্তিন ভূ-খণ্ডে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই অঞ্চলের সামরিক শক্তির কেন্দ্রে দখলদার রাষ্ট্রটি। তবে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে দেশটির যুদ্ধ শক্তি কমিয়েছে তাদের। বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে গিয়ে একপ্রকার কাবু হয়ে গেছে তেল আবিব। তবুও দেশটি সিরিয়া ফ্রন্টে যুদ্ধ বিস্তৃত করার দিকে হাঁটছে। এই পরিকল্পনার কারণে তৈরি হয়েছে দেশটির সঙ্গে তুরস্কের সরাসরি সংঘাত বেঁধে যাওয়ার শঙ্কা।
গত মঙ্গলবার উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় ইসরায়েল। তাদের দাবি ছিল, সেখানে সামরিক তৎপরতা চালাচ্ছিল তুরস্ক।
তবে সিরিয়াবিষয়ক মার্কিন দূত টম ব্যারাক পরে জানান, হামলার ছয় দিন আগে ইসরায়েল এই তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছিল। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হামলার পর এর নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসংঘ এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ।
এই ঘটনা শুধু তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্কে পরিবর্তনই নয়, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক সমীকরণেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। যেখানে ইসরায়েল আর আগের মতো শক্তিশালী অবস্থানে না থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে শক্তি কমলেও যুদ্ধ পরিত্যাগ তারা করবে দেখা যাচ্ছে না এমন লক্ষণ।
তুরস্ক যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাল
তুরস্ক এই হামলাকে উসকানি হিসেবে দেখলেও সরাসরি উত্তেজনা বাড়ায়নি। বরং পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করেছে।
আঙ্কারা বিষয়টিকে তুরস্ক-তেল আবিবের বিরোধ হিসেবে না দেখে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মতপার্থক্য হিসেবে তুলে ধরেছে।
সাধারণত তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক যোগাযোগের একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো যায়। কিন্তু এই হামলার আগে ইসরায়েল তুরস্ককে কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রকেও জানায়নি।
অনেকের মতে, ইসরায়েলের উদ্দেশ্য ছিল উত্তেজনা তৈরি করা। কারণ যে তথ্যের ভিত্তিতে হামলা চালানো হয়েছে, সেটির সত্যতা মার্কিন গোয়েন্দারা খুঁজে পায়নি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান ইস্যুতে আপাত শান্ত পরিস্থিতির পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্বাচনের আগে নতুন সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করতে চাইতে পারেন। সিরিয়া, লেবানন বা গাজা—যেকোনো জায়গায়।
তুরস্কের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, এই ফাঁদে পা না দিয়ে নিজেদের স্বার্থও রক্ষা করা। আঙ্কারা আপাতত সে চেষ্টাই করছে বলে মনে হচ্ছে।
সিরিয়া ঘিরে বড় মতপার্থক্য
সিরিয়াকে নিয়ে তুরস্ক ও ইসরায়েলের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই ভিন্ন।
তুরস্ক চায় সিরিয়ায় একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও কেন্দ্রীয় সরকার থাকুক। কারণ সেটি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে ইসরায়েল চায় সিরিয়া দুর্বল থাকুক, বিভক্ত থাকুক এবং শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা অর্জন না করুক।
তবে বিষয়টি শুধু তুরস্ক ও ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব নয়। সিরিয়াকে নিয়ে ইসরায়েল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের সঙ্গেও অনেকটা বিরোধে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য এবং আরব দেশগুলোর বেশিরভাগই একটি স্থিতিশীল ও ঐক্যবদ্ধ সিরিয়ার পক্ষে।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দেশ যদি নিজের নিরাপত্তার জন্য প্রতিবেশীদের সবসময় দুর্বল রাখতে চায়, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত আরও সংঘাত ও বিচ্ছিন্নতার পথ তৈরি করে।
নতুন আঞ্চলিক জোটের উত্থান
সম্প্রতি তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে হওয়া ‘মক্কা চুক্তি’ নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই জোট সরাসরি ইসরায়েলবিরোধী নয়। তবে এটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এখন নতুন পথে এগোচ্ছে।
এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে যে আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল, তার কেন্দ্র ছিল ইসরায়েল ও কিছু মিত্র আরব রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে তেল আবিবের সঙ্গে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক তৈরি করা সেই চিন্তারই অংশ ছিল।
কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এসব পরিকল্পনা মূলত ইসরায়েলকেন্দ্রিক ছিল। আর ইসরায়েলের সাম্প্রতিক আগ্রাসী নীতিই সেই চেষ্টাকে দুর্বল করে দিয়েছে।
ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে অনেক আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশের দূরত্ব বেড়েছে। সম্পর্ক স্বাভাবিক করাও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রও অবস্থান বদলাচ্ছে
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
এক দশকের বেশি সময় ধরে ওয়াশিংটন এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামো গড়তে চেয়েছিল, যেখানে ইসরায়েল গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই ধারণা আর আগের মতো কার্যকর নয়।
অনেকে মনে করেন, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ ইসরায়েলের নিজস্ব নীতিই।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এখন নতুন এক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। সেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ ও সহযোগিতার ভিত্তিতে নতুন জোট গড়ছে।
আর ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পুরোনো ধারণা ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে।
সিরিয়ার প্রশ্নেও একটি বিস্ময়কর ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, তুরস্কের মতো যুক্তরাষ্ট্রও আল শারা নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারকে সমর্থন করছে।
এই অবস্থানে সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ইসরায়েল।
এক অর্থে, সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে ইসরায়েল এখন আঞ্চলিক মূলধারার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
নতুন মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্র কোথায়
আজকের সংকট শুধু সিরিয়ার নয়। এটি পুরো অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার গল্প।
ইসরায়েল এখনও শক্তিশালী সামরিক শক্তি। কিন্তু আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্র ধরে রাখা আগের মতো সহজ নয়।
তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ দেখাচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্য ধীরে ধীরে একক শক্তিকেন্দ্র থেকে বহু-কেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।
সেই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন আর ‘কে সবচেয়ে শক্তিশালী’ নয়; বরং কে আঞ্চলিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে পারছে।
আলজাজিরায় প্রকাশিত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল অর্ডারস প্রোগ্রামের সহ-পরিচালক গালিপ দালের মতামত থেকে অনূদিত