Image description

একই পুরুষ ইঁদুরের জিনগত উপাদান ব্যবহার করে পূর্ণাঙ্গ পুরুষ ও স্ত্রী ইঁদুরের জন্ম দিয়েছেন জাপানের একদল বিজ্ঞানী। জিন সম্পাদনা বা ‘জিন এডিটিং’ প্রযুক্তির সাহায্যে পুরুষ ভ্রূণ থেকে ওয়াই (Y) ক্রোমোজোম সম্পূর্ণ অপসারণ করে এই রূপান্তর ঘটানো হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের দাবি, দ্বিলিঙ্গীয় ক্লোনিং (Dual-sex cloning) নামের এই পদ্ধতির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া ইঁদুরগুলো সম্পূর্ণ সুস্থ এবং প্রজননে সক্ষম। বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে থাকা যেসব প্রাণীর কেবল একটিমাত্র পুরুষ বেঁচে রয়েছে, বা যেসব প্রাণীর কেবল বরফজাত টিস্যু অবশিষ্ট আছে, সেগুলোকে রক্ষা করতে এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী নিউ সায়েন্টিস্ট-এ প্রকাশিত এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রযুক্তির মূল উদ্ভাবক জাপানের ইয়ামানাসি ইউনিভার্সিটির গবেষক তাকাসি ইশিউচি। তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম নিষেকের পরপরই যদি ওয়াই ক্রোমোজোম সরিয়ে নেওয়া যায়, তবে লিঙ্গ পরিবর্তন সম্ভব। এটি মূলত কৃত্রিম উপায়ে লিঙ্গ রূপান্তর। ’

যেভাবে হলো এই রূপান্তর
প্রকৃতিতে জেলিফিশের মতো কিছু প্রাণী কিংবা হাঙ্গর ও কিছু প্রজাতির গিরগিটি পুরুষ ছাড়াই ‘পার্থেনোজেনেসিস’ প্রক্রিয়ায় বংশবৃদ্ধি করতে পারে।

আবার কিছু সামুদ্রিক মাছ প্রয়োজন অনুযায়ী লিঙ্গ পরিবর্তন করতে সক্ষম। এই প্রাকৃতিক কৌশল থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই গবেষকেরা কাজ শুরু করেন।

গবেষণায় প্রথমে একটি পুরুষ ইঁদুরের রক্তের কোষ থেকে ডিএনএ নিয়ে অন্য একটি ডিম্বাণুতে প্রতিস্থাপন করা হয় (যাকে বলা হয় সোম্যাটিক সেল নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার)। এরপর ‘ওয়াই-কাট’ (Y-CUT) নামক ক্রিসপার-ভিত্তিক (CRISPR) একটি বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরুষ ভ্রূণের ওয়াই ক্রোমোজোম কেটে বাদ দেওয়া হয়।এই ভ্রূণগুলো গর্ভধারক (সারোগেট) স্ত্রী ইঁদুরের দেহে প্রতিস্থাপন করার পর জন্ম নেওয়া সবকটি বাচ্চা ইঁদুরই স্ত্রী লিঙ্গের এবং এদের বাবার জিনগত ক্লোন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আর যেসব ভ্রূণে ‘ওয়াই-কাট’ প্রয়োগ করা হয়নি, সেগুলো স্বাভাবিক পুরুষ ইঁদুর হিসেবে জন্ম নেয়।

গবেষণাদলের সদস্য ও রিকেল বায়োরিসোর্স রিসার্চ সেন্টারের বিজ্ঞানী শোগো মাতোবা জানান, জন্ম নেওয়া স্ত্রী ও পুরুষ ক্লোন ইঁদুরগুলো নিজেদের মধ্যে প্রজনন করতে সক্ষম হয়েছে এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মও এক বছরের বেশি সময় ধরে সুস্থভাবে বেঁচে রয়েছে।

বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী সংরক্ষণে কাজ করা সংস্থা ‘রিভাইভ অ্যান্ড রিস্টোর’-এর গবেষক বেন নোভাক এই গবেষণাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘যেসব প্রাণীর মাত্র এক বা দুটি নমুনা বা সংগৃহীত টিস্যু রয়েছে, তাদের প্রজননপ্রক্রিয়া সচল রাখতে এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ’

তবে অন্যান্য বন্যপ্রাণীর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রয়োগে কিছু বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক জটিলতা রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সাউথইস্ট জু অ্যান্ড কনজারভেশন সোসাইটির গবেষক লিন্ডা পেনফোল্ড জানান, ইঁদুরের ক্ষেত্রে ওয়াই ক্রোমোজোমহীন স্ত্রী ইঁদুর সন্তান জন্মদানে সক্ষম হলেও মানুষ বা ঘোড়ার ক্ষেত্রে তা বন্ধ্যাত্বের সৃষ্টি করে। ফলে অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রে এটি কার্যকর না-ও হতে পারে।

এ ছাড়া একটিমাত্র প্রাণীর ডিএনএ থেকে বংশবৃদ্ধি করলে প্রজন্মান্তরে জিনগত বৈচিত্র্য থাকে না, যা যেকোনো প্রজাতির বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

তবে বিজ্ঞানী ইশিউচির মতে, ‘রিভারসিন’ (Reversine) নামক একটি ওষুধের সাহায্যে এই সমস্যা সমাধানের সুযোগ রয়েছে, যা এক-ক্রোমোজোমবিশিষ্ট কোষে দ্বিতীয় এক্স (X) ক্রোমোজোম তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্লোনিং বা জিন সম্পাদনার রূপান্তরমূলক প্রযুক্তি আশাব্যঞ্জক হলেও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা ও শিকার বন্ধ করাই প্রজাতি রক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর পথ।

শীর্ষনিউজ