পৃথিবীতে মানবসভ্যতা যত এগিয়েছে, তত বিপন্ন হয়েছে বরফাচ্ছাদিত মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা। বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলছে দ্রুত গতিতে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে এ বার পৃথিবীর সর্ব দক্ষিণের এই বিশাল মহাদেশ অন্য এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, অ্যান্টার্কটিকা থেকে বিষাক্ত ধাতু ক্রমাগত মিশছে সমুদ্রে। শিগগিরৈই যার প্রভাব পড়তে পারে মানবসভ্যতার ওপর।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে সব রাসায়নিককে মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে, তার প্রথম ১০ টির তালিকায় রয়েছে পারদ। সামান্য মাত্রাতেও এটি বিষাক্ত। অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে দিনের পর দিন সেই পারদই মিশছে সমুদ্রে।
সাধারণভাবে আগ্নেয়গিরি থেকে এবং কিছু ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পারদ পরিবেশে মেশে। তবে সেই পরিমাণ তেমন উদ্বেগের নয়। বিজ্ঞানীদের দাবি, শিল্পের প্রয়োজনে আরো বেশি করে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, মাটিতে খননকার্যের ফলে পরিবেশে পারদের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছে। তাতেই ঘনিয়েছে বিপদ। এখানে অবশ্য আগেই মানব সভ্যতার ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে অ্যান্টার্কটিকা। বছরের পর বছর ধরে এই মহাদেশের বরফ ‘পারদ শোষক’ হিসেবে কাজ করে আসছে। অর্থাৎ, পরিবেশ থেকে পারদ শুষে নেয় অ্যান্টার্কটিকা। তার বরফে আটকে থাকে বিপুল পরিমাণ পারদ-দূষণ!
কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। যে সব ভারী শিল্পের কারণে পরিবেশে পারদ নির্গত হচ্ছে, সেগুলোই আবার গ্রিনহাউস গ্যাসও উৎপন্ন করছে। ফলে বায়ুমণ্ডলে এই ধরনের গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে। আর এই সব বিষাক্ত গ্যাস অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ, যে বরফরাশি শিল্পে উৎপন্ন পারদ শোষণ করে দূষণ আটকাচ্ছে, সেই বরফই গলে যাচ্ছে সেই শিল্প ও বায়ুদূষণের কারণে। ফলে বরফের পারদ শোষণে হিতে বিপরীত হচ্ছে। সম্প্রতি অ্যান্টার্কটিকায় এই সমীকরণই চোখে পড়েছে বিজ্ঞানীদের।
চিনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি অ্যান্টার্কটিকার বরফ ও পারদ দূষণ নিয়ে একটি গবেষণা করেছেন। নেতৃত্বে ছিলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ চেংঝেন ঝোউ। ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ তারা গবেষণার ফলাফল ব্যাখ্যা করেছেন এবং অ্যান্টার্কটিকার পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন। গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে পিএনএএস পত্রিকায়। অ্যান্টার্কটিকার যে অংশের বরফ পরিবেশ দূষণের কারণে সবচেয়ে দ্রুত গলে যাচ্ছে, তাকে বিজ্ঞানীরা অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপ হিসেবে চিহ্নিত করেন। সেখানকার পলির নমুনা বিশ্লেষণ করতে গিয়েই উদ্বেগের কারণ ধরা পড়েছে।
সারাবিশ্বে যেখানে যত পারদ সঞ্চিত হয়, অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের বরফে তার দ্বিগুণ পরিমাণ পারদ জমে। বিজ্ঞানীদের দাবি, অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে শিল্পবিপ্লব হওয়ার পর এই অংশে পারদ সঞ্চয়ের হার ১৬০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল।
পারদ দূষণের দু’টি চক্র পরিবেশে সক্রিয়। এক, বায়ুমণ্ডল থেকে সমুদ্রের পানিতে পারদ শোষিত হতে পারে এবং সেখান থেকে আবার তা বাতাসে মিশতে পারে। দুই, অ্যান্টার্কটিকার মতো বরফসমৃদ্ধ এলাকায় পারদ বায়ুমণ্ডল থেকে হিমবাহে শোষিত হয়। সেখান থেকে স্থলভাগ হয়ে আবার সমুদ্রে মেশে। ঝোউ গবেষণাপত্রে লিখেছেন, ‘এই দুই চক্রের সংযোগের ফলে বরফ গলে স্থলভাগে পারদের নির্গমন ৫৫০ শতাংশ এবং বায়ুমণ্ডল থেকে সমুদ্রে পারদের বিনিময় ৩৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।’ এ ভাবে অ্যান্টার্কটিকার সুবিশাল পারদের ভান্ডার ধীরে ধীরে দূষণের উৎসে পরিণত হয়েছে।
একটি পুরনো গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, অ্যান্টার্কটিকার বরফে এমন এক ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, যা পারদকে শক্তিশালী নিউরোটক্সিন মিথাইল মার্কারিতে পরিণত করতে সক্ষম। এই মৌল সামুদ্রিক প্রাণীদের দেহেও জমা হয়। সেখান থেকে তা আসতে পারে মানুষের দেহে। ঝোউ বলেন, ‘অ্যান্টার্কটিকায় পারদ দূষণের বর্তমান পরিস্থিতি সেখানকার বাস্তুতন্ত্রেক ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।’
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, দক্ষিণের মহাসাগরে প্রাণীদের দেহে পারদের মাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা আগের রেকর্ডকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপ থেকে স্রোতের মাধ্যমে খোলা সমুদ্রে পারদ নির্গমনের মাত্রা বেড়েছে ৪০০ শতাংশ। এই দূষণ আগামী দিনে আরো দূরের সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
সূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন