ইরান ও কুয়েতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে উত্তেজনার মুখে পড়েছে। একসময় উপসাগরীয় যুদ্ধের (১৯৯০-৯১) সময় কুয়েতের পাশে দাঁড়িয়ে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এবং দেশটির জ্বলন্ত তেলকূপ নেভাতে সহায়তা করেছিল ইরান। কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে স্পষ্ট অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক মাধ্যমে কুয়েতকে ‘অশুভ শক্তির আগুনের অংশ’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইরান সবসময় প্রতিবেশীসুলভ নীতি অনুসরণ করলেও কুয়েত সেই সহায়তার প্রতিদান দেয়নি। তার এই মন্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন কুয়েতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়।
অন্যদিকে, কুয়েত সরকার দাবি করেছে, তাদের ভূখণ্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনা করেনি। একই সঙ্গে কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইরানের হামলাকে ‘অপরাধমূলক আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
ইরান-ইরাক যুদ্ধ থেকেই সম্পর্কের টানাপোড়েন
ইরান ও কুয়েতের মধ্যে বহু বছর ধরে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক থাকলেও ১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। সে সময় কুয়েত ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে বিপুল আর্থিক ঋণ, লজিস্টিক সহায়তা এবং বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেয়।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর কুয়েতের শাসকগোষ্ঠী আশঙ্কা করেছিল, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং কুয়েতের শিয়া জনগোষ্ঠীকে বিদ্রোহে উসকে দিতে পারে। যুদ্ধ চলাকালে কুয়েতের তেলবাহী জাহাজ, কূটনৈতিক স্থাপনা ও বিমান চলাচলের ওপর হামলার জন্যও ইরানকে দায়ী করা হলেও এসব ঘটনায় রাষ্ট্রীয়ভাবে ইরানের সম্পৃক্ততার চূড়ান্ত প্রমাণ কখনো পাওয়া যায়নি।
উপসাগরীয় যুদ্ধে বদলে যায় সম্পর্ক
১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত দখল করার পর দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক জোট ইরাকের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালালে কুয়েতে বড় ধরনের মানবিক সংকট সৃষ্টি হয় এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
সে সময় ইরান হাজার হাজার কুয়েতি, বিদেশি শ্রমিক, রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি এবং ইরাকি নাগরিককে আশ্রয় দেয়। ইরানের খুজেস্তান প্রদেশে অস্থায়ী শরণার্থী শিবির স্থাপন করে খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয় ও বিদেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়। সে সময় ব্রিটিশ সংসদ সদস্যরাও ইরানের মানবিক উদ্যোগের প্রশংসা করেছিলেন।
জ্বলন্ত তেলকূপ নেভাতে ইরানের ভূমিকা
কুয়েত থেকে পিছু হটার আগে ইরাকি বাহিনী শত শত তেলকূপে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং উপসাগরে বিপুল পরিমাণ তেল ছড়িয়ে দেয়, যা ইতিহাসের অন্যতম বড় পরিবেশগত বিপর্যয়ে পরিণত হয়। বিষাক্ত ধোঁয়া ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে ইরান ৪৭ জন প্রকৌশলী ও তেল বিশেষজ্ঞের একটি দল কুয়েতে পাঠায়। তারা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে বারগান তেলক্ষেত্রে কাজ করে ২৮টি জ্বলন্ত তেলকূপ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। এই মানবিক ও কারিগরি সহায়তা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ১৯৯০-এর দশকে কূটনৈতিক সংলাপ, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়তে থাকে।
মার্কিন ঘাঁটি ঘিরে নতুন উত্তেজনা
উপসাগরীয় যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯টি সামরিক ঘাঁটির মধ্যে পাঁচটি কুয়েতে অবস্থিত, যেখানে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী সামরিক উপস্থিতিকে নিজের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কুয়েতের ঘাঁটি আঞ্চলিক সামরিক অভিযানে ব্যবহারের খবর প্রকাশিত হলেও কুয়েত সরকার তা অস্বীকার করেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় কুয়েতসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ইরানের বিশ্লেষকদের মতে, এটি কুয়েতের অবস্থান নিয়ে তেহরানের সন্দেহ আরো বাড়িয়েছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি
এরই মধ্যে কুয়েত পাকিস্তানের সঙ্গে পাঁচ বছরের একটি নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুমোদন করেছে। এতে সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি স্বাভাবিক হলেও বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনার সময়ে এর অনুমোদন কুয়েতের নিরাপত্তা কৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে ইরান আপাতত এই চুক্তির বিরোধিতা না করে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
একসময় যুদ্ধের কঠিন সময়ে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো ইরান ও কুয়েতের সম্পর্ক এখন ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
সূত্র: মিডলইস্ট আই