Image description

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক চাপ বাড়ার পর একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে। তেহরানের এত মিত্র গেল কোথায়? চীন, রাশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কেন সম্মিলিতভাবে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে না?

প্রশ্নটির সহজ উত্তর হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্ব আর সামরিক জোট এক জিনিস নয়। ইরানের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার গভীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো মিত্রদের মতো ইরানকে রক্ষার বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতি তাদের নেই। ফলে তেহরানের পাশে দাঁড়ানোর ভাষা যত জোরালো, যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের অবস্থান ততটাই হিসাবি।

কাগজে অংশীদার, আইনে সামরিক মিত্র নয়

২০২৫ সালে রাশিয়া ও ইরান একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকর করে। এতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু চুক্তিতে এমন কোনো ধারা নেই, যার অধীনে ইরান আক্রান্ত হলে রুশ বাহিনীকে বাধ্যতামূলকভাবে যুদ্ধে নামতে হবে।

অর্থাৎ এটি ন্যাটোর অনুচ্ছেদ পাঁচের মতো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়। চুক্তি অনুযায়ী একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশ হামলাকারীকে সহায়তা করবে না। কিন্তু আক্রান্ত পক্ষের হয়ে সরাসরি যুদ্ধ করার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়নি। এই আইনি ব্যবধানই মস্কোকে তেহরানের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার সুযোগ দিয়েছে।

চীনের সঙ্গেও ইরানের ২৫ বছরের কৌশলগত সহযোগিতা রয়েছে। কিন্তু সেটিও মূলত বাণিজ্য, জ্বালানি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কাঠামো। কোনো দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশ সেনা পাঠাবে, এমন প্রতিশ্রুতি সেখানে নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ চায় না কেউ

ইরানকে প্রকাশ্যে অস্ত্র, যুদ্ধবিমান কিংবা সেনা দিয়ে সহায়তা করার অর্থ হবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি নেওয়া। চীন ও রাশিয়া দুটিই ওয়াশিংটনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর যুদ্ধ এক বিষয় নয়।

মস্কো ও বেইজিং চায় যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত থাকুক, তার অর্থ ও সামরিক সম্পদ ক্ষয় হোক। কিন্তু সেই ক্ষয়যুদ্ধে নিজেরা প্রবেশ করতে চায় না। কারণ ইরানের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে নামলে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর মুখোমুখি লড়াইয়ে রূপ নিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রও চীন ও রাশিয়াকে প্রকাশ্য সামরিক সহায়তা না দেওয়ার জন্য সতর্ক করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চীনা ও রুশ নেতারা ইরানকে অস্ত্র না দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। যদিও ওয়াশিংটনের কিছু কর্মকর্তা সন্দেহ করছেন, পর্দার আড়ালে প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের আদান–প্রদান হতে পারে।

চীনের কাছে ইরান গুরুত্বপূর্ণ, তবে একমাত্র অংশীদার নয়

ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং তেলের প্রধান ক্রেতা চীন। ইরানি তেল কেনার মাধ্যমে বেইজিং তেহরানকে গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ করে দেয়। চীনা প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ, নেভিগেশন ব্যবস্থা এবং দ্বৈত ব্যবহারের উপকরণও ইরানের সামরিক সক্ষমতায় ভূমিকা রেখেছে। তবে যুদ্ধ শুরুর পর চীন প্রকাশ্যে বড় সামরিক সহায়তা দেওয়া থেকে বিরত রয়েছে।

কারণ চীনের স্বার্থ শুধু ইরানে সীমাবদ্ধ নয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও চীনের বিশাল বাণিজ্য ও জ্বালানি সম্পর্ক রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে ইরানের পাশাপাশি চীনের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই বেইজিং এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় না, যাতে আরব দেশগুলো তার বিরুদ্ধে চলে যায় কিংবা বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দীর্ঘ সময় অচল থাকে।

ইরান চীনা তৈরি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা করছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে চীন ও সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষগুলো সরাসরি সরকারি সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এটি দেখায়, সহায়তা এলেও তা সরাসরি রাষ্ট্রের পতাকা নিয়ে নয়, বরং কোম্পানি, মধ্যস্থতাকারী বা গোপন সরবরাহপথে আসার সম্ভাবনাই বেশি।

রাশিয়ার হাতও পুরোপুরি খোলা নয়

রাশিয়ার জন্য ইরান গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র, জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক অংশীদার। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ মস্কোর সেনাবাহিনী, অর্থনীতি ও অস্ত্রভান্ডারের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরেকটি প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু করা রাশিয়ার জন্য বিপজ্জনক।

তারপরও রাশিয়া ইরানকে পুরোপুরি একা ছেড়ে দিয়েছে, এমনটি বলা যাবে না। মার্কিন কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার নির্ভুলতা বাড়াতে রুশ গোয়েন্দা তথ্য বা প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ ধরনের সহায়তার পূর্ণ মাত্রা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। মস্কো প্রকাশ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মধ্যস্থতার কথাই বলছে।

আঞ্চলিক মিত্ররা কি নিষ্ক্রিয়?

ইরানঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় নয়। ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি স্থাপনা ও নৌপথে চাপ সৃষ্টি করছে। ইরাকের ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও মার্কিন ও সৌদি স্বার্থের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িয়েছে বলে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা দাবি করছেন। তবে এসব গোষ্ঠীর নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হিজবুল্লাহ দীর্ঘ লড়াইয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত এবং লেবাননের অভ্যন্তরীণ চাপ সামলাচ্ছে। ইরাকি গোষ্ঠীগুলোকে আবার বাগদাদ সরকারের চাপ, মার্কিন পাল্টা হামলা এবং সৌদি প্রতিশোধের ঝুঁকি বিবেচনা করতে হচ্ছে। হুতিরাও ইরানকে রক্ষার চেয়ে নিজেদের আঞ্চলিক লক্ষ্য ও ইয়েমেনের ক্ষমতার হিসাবকে অগ্রাধিকার দেয়।

শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই নিজের স্বার্থের মিত্র

ইরানের মিত্ররা তাকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করেনি। তারা তেল কিনছে, কূটনৈতিক সুরক্ষা দিচ্ছে, প্রযুক্তি সরবরাহ করছে, আলোচনার পথ খুঁজছে এবং সম্ভবত সীমিত গোয়েন্দা সহায়তাও দিচ্ছে। কিন্তু কেউই তেহরানের জন্য নিজের রাষ্ট্রকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে ঠেলে দিতে প্রস্তুত নয়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির নির্মম সত্য এখানেই। চীন ও রাশিয়া ইরানকে শক্তিশালী দেখতে চায়, কারণ শক্তিশালী ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে। কিন্তু তারা এমন শক্তিশালী ইরানও চায় না, যার জন্য নিজেদের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা বিসর্জন দিতে হয়।

তাই ইরান আজ একা নয়, আবার পুরোপুরি সুরক্ষিতও নয়। তার পাশে অংশীদার আছে, অস্ত্র বিক্রেতা আছে, তেল ক্রেতা আছে এবং কূটনৈতিক সমর্থক আছে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন বাজি রেখে দাঁড়ানোর মতো বাধ্যতামূলক সামরিক মিত্র নেই। বন্ধুত্বের ঘোষণা আছে, কৌশলগত হিসাব আছে, কিন্তু আত্মত্যাগের প্রতিশ্রুতি নেই।