Image description

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারণা ছিল কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তা গড়িয়ে ষষ্ঠ মাসে প্রবেশ করা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ এবার আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। আগের অবস্থান বদলে নিজেদের আরও আক্রমণাত্মক প্রমাণ করে এখন থেকে ‘আগে হামলা চালানোর’ নীতি বেছে নিয়েছে ইরান।

 

জর্ডান ও কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বৃহস্পতিবার এক বার্তায় সতর্ক করে বলেছে, আক্রমণকারীকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে। এর আগে জর্ডানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ব্যর্থ করে দেওয়ার জবাবে বুধবার রাতে দক্ষিণ ইরানে আইআরজিসির কমান্ড সেন্টার ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিসহ একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী।

এই পাল্টাপাল্টি হামলার মাধ্যমে অনির্ধারিত যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেল। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা দৃশ্যত একটি নতুন কৌশল গ্রহণ করছেন। তারা মূলত বার্তা দিচ্ছেন, ‘আমরা আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে দেব না; আমরাও আপনাদের চমকে দিতে পারি।’

 

 

হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হামলা বৃদ্ধি কিংবা কূটনৈতিক সমঝোতার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তবে মার্কিন কংগ্রেসের ক্রমবর্ধমান বিরোধিতা, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে ট্রাম্প চাপে রয়েছেন। নতুন একটি জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধে ট্রাম্পের ভূমিকার সমর্থনে রয়েছেন, যা গত মাসে ছিল ৩৪ শতাংশ। সমরাস্ত্রের সম্ভাব্য ঘাটতি ও জনসমর্থন কমে যাওয়ার কারণেই ট্রাম্প বারবার হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও ইরানি অবকাঠামোতে ‘ব্যাপক হামলা’ চালানো থেকে আপাতত বিরত রয়েছেন।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানি স্টাডিজের অধ্যাপক সাসন করিমি বলেন, এটি এখন একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। ইরান দেখাতে চায় যে তারা যুদ্ধের সমীকরণ নির্ধারণ করতে পারে, শুধু ওয়াশিংটনের নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া জানানো তাদের কাজ নয়।

 

বহুমুখী হচ্ছে যুদ্ধের ফ্রন্ট

যুদ্ধের রেশ এখন কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মঙ্গলবার রাতে সৌদি আরবও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং নিজ ভূখণ্ডের তেল স্থাপনায় হামলার জবাবে ইরাকে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীর ওপর মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যৌথ বিমান হামলা চালায়। এর পরপরই মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় এক বন্দরে ড্রোনের আঘাতে মার্কিন মালিকানাধীন তেল ট্যাংকারসহ দুটি জাহাজে আগুন ধরে যায়, যা মিসরে এ ধরনের প্রথম ঘটনা। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে সামুদ্রিক অবরোধের হুমকি বাড়িয়েছে।

 

সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে কাতার ও পাকিস্তান শান্তি আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর আগে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কারণে এই আলোচনা ভেঙে পড়েছিল। তবে ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ট্রাম্পের দাবির বিপরীতে বর্তমানে কেবল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেই যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।

অস্ত্রের মজুত ও কৌশলে পরিবর্তন

অ্যালেক্স ভাতানকা জানান, ইরানে কট্টরপন্থিরা আলোচনার বিরোধিতা করলেও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং আইআরজিসির শীর্ষ নেতারা বাস্তবিক সুবিধা পেলে কূটনীতিতে রাজি আছেন। জুনের মাঝামাঝি একটি খসড়া সমঝোতায় হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা ও পারমাণবিক আলোচনার শর্তে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুযোগ ছিল। কিন্তু তা ভেস্তে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

 

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিজের ইরান প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ পরিচালক বেহনাম বেন তালেবলু বলেন, ইরান যে ইস্যুতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে রাজি, সেই তালিকার পরিধি বাড়ছে। অর্থাৎ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের মানসিক বাধা কমছে।

তিনি আরও বলেন, ছোট ছোট ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইরান সম্ভবত অস্ত্র শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আগামীতে আরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্রের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।