এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাস তাদের আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এবং সংগঠনটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলে রূপ নিতে পারে কি না, তা নিয়ে কথা বলেন।
আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমার মাথায় একটাই চিন্তা- বাড়ি গিয়ে ঘুমানো, কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে দেখা করা। গত কয়েক মাস ধরে আমি বাড়ির বাইরে ছিলাম। এখন আমি সত্যিই কিছুটা স্বস্তিতে সময় কাটাতে চাই এবং গত দুই মাসে যা কিছু ঘটেছে, তা নিয়ে ভাবতে চাই।’
‘আমার মনে হয়, ঘটনাগুলো আমাদের সবার জন্যই অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও অভিভূত করার মতো। এটি গর্বের মুহূর্ত। এটি সত্যিই আনন্দিত ও স্বস্তি পাওয়ার মুহূর্ত। এরপর পরিস্থিতি কীভাবে এগোয়, তা আমরা দেখব’, যোগ করেন তিনি।
সরাসরি জানতে চাওয়া হয়, তিনি রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করছেন কি না। জবাবে রাঙ্কা বলেন, ‘আমার মনে হয়, ভারতে কোনো কিছুকেই কখনো না বলতে নেই।’
আশুতোষ ভবিষ্যতে রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে না দিলেও সৌরভ দাস জোর দিয়ে বলেন, রাজনীতিতে প্রবেশ করা তাদের সংগঠনের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য নয়।
তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্য একেবারেই স্পষ্ট। এই আন্দোলনকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। কারণ দেশে এরইমধ্যে ৭৫০ থেকে ৮০০টি রাজনৈতিক দল রয়েছে। অথচ তাদের কেউই তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারছে না।’
‘আমরা আন্দোলনটিকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে চাই, যাতে ক্ষমতায় যে রাজনৈতিক দল বা নেতাই থাকুন না কেন, তারা তরুণদের জন্য কাজ করতে এবং তাদের দাবি পূরণ করতে বাধ্য হন। এই মুহূর্তে এটিই আমাদের মূল লক্ষ্য’, যোগ করেন সৌরভ দাস।
শনিবার শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি জে পি নাড্ডা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে চূড়ান্ত বৈঠক করেন সিজেপি নেতারা। সরকার পক্ষের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বেশ ইতিবাচক জবাব দেন আশুতোষ রাঙ্কা।
বলেন, ‘বৈঠকের পরিবেশ আগের দফার আলোচনাগুলোর তুলনায় আলাদা ছিল। আজকের বৈঠকটি বেশ আন্তরিক পরিবেশে হয়েছে। আমার ধারণা, আমরা সেখানে পৌঁছানোর আগেই পদত্যাগ হয়ে গিয়েছিল। আলোচনার বেশির ভাগ অংশ বাকি দুটি দাবিকে কেন্দ্র করে হয়েছে।’
রাঙ্কা বলেন, ‘খুব দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়। এরপর আমরা সবাই একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেই, পুরো বিষয়টি আন্তরিক পরিবেশে শেষ করা হবে। আমরা যেভাবে চেয়েছিলাম, সরকার সেভাবে দাবিগুলো মেনে নেওয়ায় তাদের এ উদ্যোগের প্রশংসা করছি।’
যেভাবে আন্দোলন সফল হয়
পদত্যাগের বিবৃতিতে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের শেষ ১০ দিনের ঘটনাপ্রবাহ তাকে গভীরভাবে ‘ব্যথিত’ করেছে এবং বিষয়টি আর তার ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রশ্ন নয়।
‘দেশবিরোধী শক্তি’ যেন পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতেই তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে জানান। একই সঙ্গে ‘দেশের ঐক্য অটুট রাখা’, ‘একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎও যেন আইনি জটিলতায় আটকে না যায়’ এবং শিক্ষার্থীরা যেন পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে, সেটিও তিনি নিশ্চিত করতে চান।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে জনসমক্ষে সৃষ্টি হওয়া কোনো বিতর্কের পর পদত্যাগ করা দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
এর আগে ২০১৮ সালে যৌন হয়রানির অভিযোগ সামনে আসার পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান এম জে আকবর। নারীদের যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা প্রকাশের ‘হ্যাশট্যাগ মি টু’ বৈশ্বিক আন্দোলনের সময় তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠেছিল।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে আন্দোলনের প্রতি সরকারের অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২০ জুন দেশটির রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টি অনির্দিষ্টকালের বিক্ষোভ শুরু করার পর এ আন্দোলন অনলাইন থেকে অফলাইনে রূপান্তরিত হয়।
বিজেপির বিরোধী দল আম আদমি পার্টির (এএপি) সাবেক নেতা অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনটি মে মাসে একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্রচার হিসেবে শুরু হয়েছিল। পরে তা সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বৃহৎ যুব নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে রূপ নেয়।
তাদের সঙ্গে সমর্থন দিয়ে ২৮ জুন আন্দোলন ও অনশনে যোগ দেন লাদাখের অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। এতে আন্দোলন নতুন গতি পায়।
গত ২০ জুলাই কেন্দ্রীয় সরকার প্রথমবারের মতো ককরোচ জনতা পার্টির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। একইসঙ্গে সরকার ওয়াংচুকের সঙ্গেও আলোচনা করে। তবে শিক্ষার্থীরা পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রার কর্মসূচি দিলে তাতে বাধা দেয় পুলিশ। এতে দফায় দফায় দুই পক্ষ সংঘর্ষ জড়ালে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা থামাতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে আলোচনার প্রস্তাব দেয় সরকার। কনস্টিটিউশন ক্লাবে দ্বিতীয় দফার আলোচনায় কেন্দ্র সরকারের আশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী মোদির ভিডিও বার্তায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি আমলে নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে অনশন ভাঙেন সোনম ওয়াংচুক।
শনিবার বিকালের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের জন্য বিক্ষোভকারীরা আল্টিমেটাম দেন এবং তার আগেই পদত্যাগ করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
এক মাসের আন্দোলন নিয়ে সিজেপি নেতাদের বক্তব্য
শনিবার চূড়ান্ত দফার বৈঠকে অবশিষ্ট দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে একটি ছিল বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার। সরকার সব মামলা প্রত্যাহারে রাজি হয়েছে, নাকি শুধু শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সিজেপি মুখপাত্র রাঙ্কা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী এবং গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পার্থক্যের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘আমি পুরোপুরি নিশ্চিত, গুরুতর অপরাধী এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের মধ্যে আমরা পার্থক্য করতে পারব। ককরোচ জনতা পার্টি প্রথম দিন থেকেই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পক্ষে কথা বলে আসছে। গত ৩৭ দিনেও আমরা ঠিক সেটিই অর্জন করেছি।’
‘সরকারের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। আমি নিশ্চিত, শিগগিরই লিখিত সমঝোতাও হবে। যে সমঝোতায় পৌঁছানো হয়েছে, তাতে সব বিক্ষোভকারী ও সংগঠকের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে ককরোচ জনতা পার্টির সংগঠক ও বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা না করার বিষয় রয়েছে’, যোগ করেন রাঙ্কা।
সরকার আন্দোলনের প্রধান দাবি মেনে নেওয়ার আগে প্রায় এক মাস ধরে বিক্ষোভ চলে। সরকারের চিন্তাভাবনায় কী পরিবর্তন এসেছিল বলে তিনি মনে করেন- এমন প্রশ্নের জবাবে রাঙ্কা বলেন, ‘এ প্রশ্ন ক্ষমতাসীনদেরই করা উচিত।’
‘আমার মনে হয়, প্রশ্নটি আপনাদের সরকারের কাছেই করা উচিত। আমরা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নাড্ডাকেও ঠিক একই প্রশ্ন করেছি। শিক্ষার্থীদের ৩০ দিন ধরে রাস্তায় থাকতে হলো কেন? ২০ জুলাইয়ের মতো ঘটনা ঘটার পরই কেন সরকার সাড়া দিল? সরকারের সম্ভবত আরও আগেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত ছিল।’
রাঙ্কা বলেন, ‘আমরা সবাই শিক্ষিত মানুষ। আমরা অভিজ্ঞ আন্দোলনকারী নই। আমরা সবাই পেশাগত কাজে যুক্ত ছিলাম। রাজনীতি কিংবা এসব বিষয়ের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। অভিজিৎ দীপকে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে পড়াশোনা করছিলেন। সম্ভবত তিনি পড়াশোনা শেষে চাকরি খোঁজা শুরু করতেন।’
ধর্মেন্দ্র প্রধান তার পদত্যাগপত্রে ইঙ্গিত দেন, কিছু মানুষ আন্দোলনটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিল। এ বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে রাঙ্কা বলেন, তিনি আশা করেন, সরকার বিক্ষোভকারীদের দেশের শত্রু হিসেবে তুলে ধরা বন্ধ করবে।
তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টির খুঁটিনাটিতে যেতে চাই না। তবে আশা করি, তিনি এখনো আমাদের দেশবিরোধী বা ভাইরাস বলতে চাইবেন না। কারণ বেশ কিছুদিন ধরে আমাদের ঠিক এসব নামেই ডাকা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত আমি মনে করি, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’