Image description

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি বিদ্রোহীরা। চার বছর যুদ্ধবিরতি মেনে চলার পর হুথি নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে বোমা হামলার জবাবে সোমবার এ হামলা চালায় তারা।

ধারণা করা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র নতুন সংঘাতে উপসাগরীয় দেশগুলো তেহরানের হামলার সম্মুখীন হওয়ায় তার জবাব হিসেবে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে হামলা জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী দেশগুলো। এই ঘটনায় সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় চার বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন জোটের মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে ‘হুথি মিলিশিয়া’ যে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, তা প্রতিহত করা হয়েছে।

অন্যদিকে, হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, তারা সৌদি আরবের আভা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। আভা হলো সৌদি আরবের পাহাড়ি দক্ষিণাঞ্চলের রাজধানী। এই অঞ্চলটি ইয়েমেন সীমান্তবর্তী।

২০২২ সালের মার্চে অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এটিই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের প্রথম হামলা, যার দায় তারা স্বীকার করেছে। ২০২২ সালে হুথিরা সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পর ওই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল।

সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে হওয়া এই যুদ্ধবিরতি বেশিরভাগ সময় কার্যকর ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেও এই বিরতি টিকে ছিল।

 

এদিকে সোমবারের এই সহিংসতা সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। এর আগে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল ও রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। তবে এপ্রিলের শেষ দিকে ওয়াশিংটন-তেহরান যুদ্ধবিরতি কার্যকরের সম্ভাবনায় এসব হামলা কমে আসে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য ছোট দেশের তুলনায় সৌদি আরবের ভৌগোলিক আয়তন বড় হওয়ায় দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো সংঘাতের সময় তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। এমনকি হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার পরও দেশটি পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিম উপকূলে লোহিত সাগরের পথে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছিল।

তবে লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে হুথিদের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে সৌদি আরবের জন্য তেল রপ্তানিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অবশ্য সৌদি সরকারের যোগাযোগ দপ্তর এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে থাকা হুথি মুভমেন্ট সোমবার এক অভিযোগে জানিয়েছে, সৌদি আরব সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে কঠোর পাল্টা হামলার হুমকি দেয় তারা।

সৌদির ওই হামলাকে ‘নির্লজ্জ আগ্রাসন’ হিসেবে উল্লেখ করে হুথি বিদ্রোহীরা জানান, এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমনের সময় শেষ হয়েছে। তারা আরও সতর্ক করে দেন, সানা বিমানবন্দরের ওপর থেকে সৌদি ‘অবরোধ’ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কোনো বিমান যেন সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার না করে।

সানায় সৌদি আরব কয়েক দফা বিমান হামলা চালায় বলে দাবি করে হুথিরা। ছবি: এপি/ইউএনবি

এদিকে সানা বিমানবন্দরে ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার। তবে তারা সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত, এমনকি এই সরকারের বেশিরভাগ প্রতিনিধিই সৌদি আরবের বাসিন্দা।

ইয়েমেন সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশটির সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে একটি ইরানি বিমানের অবতরণ ঠেকাতে সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা চালানো হয়েছে।

মন্ত্রণালয় আরও জানায়, ইয়েমেনের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে কোনো শত্রু বিমান প্রবেশ করলে তা প্রতিহত করতে সরকারি বাহিনী ‘সব ধরনের উপায়’ ব্যবহার করবে এবং এর পেছনে ইরান দায়ী থাকবে।

পরে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর একজন মুখপাত্র জানান, ওই বিমানটি সানায় অবতরণে ব্যর্থ হয়ে হুথি নিয়ন্ত্রিত হোদেইদাহ বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে।

তবে সানা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে লোহিত সাগর উপকূলের হোদেইদাহ বিমানবন্দরে বিমানটি অবতরণ ঠেকানোর কোনো চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, তা পরিষ্কার নয়।

এদিকে, ইয়েমেনের আরেক মন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, হুথিরা সানা বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির আরেকটি বিমান আটকে রেখেছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মুখপাত্র হাশেম ওসেইরান জানান, সংস্থার সব কর্মী ও বিমানের ক্রুরা নিরাপদে আছেন এবং তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুথি ও ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের মধ্যস্থতায় একটি বন্দিবিনিময় চুক্তির উদ্যোগ ভেস্তে যায়। উভয় পক্ষ একে অপরকে দায়ী করায় সে সময় থেকেই নতুন করে উত্তেজনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

ইয়েমেনে এক দশকের বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ ও বাইরের শক্তিগুলোর উস্কানিতে সংঘাত চলছে। হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে দক্ষিণাঞ্চলে সরে যেতে বাধ্য করার পর এই সংঘাত শুরু হয়।

২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। এর ফলে ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়।

গত বছরের শেষ দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বিদ্রোহীরা দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকা দখল করে নিলে আবারও সহিংসতা বেড়ে যায়। এর ফলে হুথিদের বিরুদ্ধে গঠিত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যেও বিভাজন তৈরি হয়।