চীন উপকূলের কাছে লুকিয়ে থাকা একটি সাবমেরিন থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বেইজিং। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর মাধ্যমে মূলত পারমাণবিক অস্ত্রের সব ধরনের সক্ষমতা অর্জনে চীনের দৃঢ়তার কথাই প্রকাশ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে সাগরে মোতায়েনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। যা দীর্ঘদিন ধরে বেইজিংয়ের একটি দুর্বল জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
সোমবারের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাটি এমন এক সময়ে চালানো হলো, যখন দুর্নীতি ও আনুগত্যহীনতার অভিযোগে একের পর এক শীর্ষ কমান্ডারকে অপসারণের কারণে চীনা সামরিক বাহিনী বেশ কয়েক বছর ধরে নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, এই পরীক্ষা প্রমাণ করে যে চীন একটি পূর্ণাঙ্গ নিউক্লিয়ার ট্রায়াড (স্থল, আকাশ ও সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থা) গড়ার সঠিক পথেই রয়েছে। এর ফলে আঞ্চলিক কোনও সংকট বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের ক্ষেত্রে বেইজিং বাড়তি সুবিধা পাবে।
চীনা কর্মকর্তারা এই পরীক্ষা নিয়ে নীরব থাকলেও দেশটির কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস মঙ্গলবার এক নিবন্ধে লিখেছে, আমাদের জাতীয় নিউক্লিয়ার ট্রায়াড আরও এক ধাপ উন্নত হলো। চীনা সেনাবাহিনীর সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক শক্তি এখন প্রশান্ত মহাসাগরের যেকোনও প্রান্ত থেকে সুস্থিত ও নির্ভরযোগ্য কৌশলগত পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম।
যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই দাবি কিছুটা অতিরঞ্জিত, কারণ চীন এখনও সাবমেরিন নিখুঁতভাবে লুকিয়ে রাখার প্রযুক্তিতে আমেরিকা বা রাশিয়ার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইভান এস মেডিরোস বলেন, চীন বিশ্বকে এই বার্তাই দিলো যে তাদের এখন একটি পূর্ণাঙ্গ কার্যকর নিউক্লিয়ার ট্রায়াড রয়েছে এবং তারা আমেরিকার প্রতিরক্ষা কৌশলের সীমা পরীক্ষা করছে।
ইতিহাসে এটি মাত্র তৃতীয়বার, যখন চীন প্রশান্ত মহাসাগরে এমন দূরপাল্লার পরীক্ষা চালালো; এর আগে ১৯৮০ এবং ২০২৪ সালে এমনটি করা হয়েছিল। সাধারণত চীন তাদের নিজেদের সীমানার ভেতরেই এই পরীক্ষাগুলো করে থাকে। তবে এবারের পরীক্ষাটি কোন সাবমেরিন থেকে চালানো হয়েছে তা বেইজিং প্রকাশ করেনি।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এটি চীনের সবচেয়ে উন্নত টাইপ ০৯৪ সাবমেরিন হতে পারে এবং ক্ষেপণাস্ত্রটি সম্ভবত আন্তঃমহাদেশীয় জেএল-৩। মার্কিন নৌ গোয়েন্দা দফতরের তথ্যমতে, চীনের বর্তমানে ১৪টি পারমাণবিক সাবমেরিন রয়েছে, যার মধ্যে ৬টি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম, যেখানে আমেরিকার রয়েছে প্রায় ৭০টি। তবে চীন দ্রুত এই ব্যবধান ঘুচিয়ে সংখ্যার দিক থেকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক জাস্টিন বাসি বলেন, চীন বিশ্বকে দেখাচ্ছে যে প্রশান্ত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের জন্য তাদের হাতে এখন বড় একটি লাঠি রয়েছে।
এই পরীক্ষার মাধ্যমে চীন মূলত আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানার সক্ষমতা জানান দিলো। ন্যাটো-র অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক উইলিয়াম অ্যালবার্ক জানান, আমেরিকা প্রতি বছর প্রশান্ত মহাসাগরে ৫ থেকে ১০টি ট্রাইডেন্ট ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। চীনও এখন তাদের সাবমেরিনগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি সুরক্ষিত রেখে দূরপাল্লার আঘাত হানার এই দুর্গ কৌশল যাচাই করে নিলো, যাতে আমেরিকার কোনও আক্রমণের মুখেও তারা নিরাপদ থেকে বড় পাল্টা আঘাত হানতে পারে।