দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনা ‘প্রোপাগান্ডা’ ছড়ানোর অভিযোগে বিতর্ক সৃষ্টি করা আলোচিত চলচ্চিত্র ‘ডিয়ার ইউ’-এর একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বেইজিং। ‘চীনকে আরও ভালোভাবে বোঝাতে’ ৭৪টি দেশের ১৫০ জন বিদেশি কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের এ প্রদর্শনীতে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত সোমবারের এই প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পেরুসহ ৭৪টি দূতাবাসের কূটনীতিকরা।
চলচ্চিত্রটি গুয়াংডং প্রদেশের চাওশান অঞ্চলে প্রচলিত তেওচিউ উপভাষায় নির্মিত। এতে দেখানো হয়েছে, ১৯৪০-এর দশকে থাইল্যান্ড থেকে পাঠানো চিঠির মাধ্যমে একজন ব্যক্তি কীভাবে অর্ধশতাব্দীজুড়ে তার পরিবারের সংগ্রামের ইতিহাস জানতে পারেন।
গল্পে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অভিবাসন এবং প্রবাসী চীনা জনগোষ্ঠীর নিজেদের ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রচেষ্টার বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে চীনের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হং লেই বলেছেন, বিপুলসংখ্যক চীনা নাগরিক বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে নিজেদের জীবন ও কর্মজীবন গড়ে তুলেছেন।
তার মতে, চলচ্চিত্রটি সাধারণ চীনা মানুষের মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা এবং তাদের আন্তরিক মানবিকতার প্রতিফলন।
হং লেই বললেন, ‘আমি আশা করি, এই চলচ্চিত্র দেখার মাধ্যমে সবাই চীনা জনগণের হৃদয় ও মনোজগতকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন এবং চীনকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।’
প্রদর্শনী শেষে কূটনীতিকরা চলচ্চিত্রটির নির্মাতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তারা চীনের সঙ্গে জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় আরও জোরদারের অঙ্গীকার করেন।
মাত্র ১ কোটি ৪০ লাখ ইউয়ান (প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলার) বাজেটে নির্মিত ডিয়ার ইউ চলতি বছরের সবচেয়ে বড় বক্স অফিস চমকগুলোর একটি। মুক্তির দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, ২৭ জুন পর্যন্ত ছবিটির আয় দাঁড়ায় ১৯০ কোটি ইউয়ান।
মূলত নতুন অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে নির্মিত ছবিটি এপ্রিলে মুক্তি পায়। শুরুতে এটি দেশের ৪ শতাংশেরও কম প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়েছিল। তবে দর্শকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে এটি পরে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
বর্তমানে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা ও জাপানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারেও চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হচ্ছে।
তবে ছবিটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে চীনের ‘সফট পাওয়ার’ নিয়ে বিতর্কও উসকে দিয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, এটি কি কেবল প্রবাসী চীনা পরিবারের আবেগঘন গল্প, নাকি বেইজিংয়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশলের অংশ?
চলচ্চিত্রটির প্রযোজক লুও ঝানহং প্রকাশ্যে চীনের ইউনাইটেড ফ্রন্ট ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। বিদেশে বসবাসকারী চীনা জনগোষ্ঠীকে কমিউনিস্ট পার্টির লক্ষ্য ও নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখাই সংস্থাটির দায়িত্ব।
সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী লি সিয়েন লুংয়ের চীন সফরেও এ ধরনের প্রশ্ন উঠে আসে। যদিও তিনি বক্তব্যে এই চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
লি বলেছেন, সিঙ্গাপুরের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ‘পারস্পরিক স্বার্থের’ ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে, ‘একই জাতিগত পরিচয় বা বংশগত সম্পর্কের’ ভিত্তিতে নয়।
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আরও বললেন, ‘আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ চীনা জনগোষ্ঠীর দেশ হলেও আমরা একটি বহুজাতিক সমাজ। আমরা চীনের থেকে পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্র।’