বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শোক সমাবেশের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে ইরান। শহীদ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির জানাজা ও দাফনকে কেন্দ্র করে যে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, তা শুধু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসেই নয়, সমকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণসমাবেশে পরিণত হতে যাচ্ছে।
তেহরানের মেয়র আলী রেজা যাকানি ইতোমধ্যে দাবি করেছেন, রাজধানীতে অনুষ্ঠেয় প্রধান শোকযাত্রায় প্রায় দুই কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন। যদি এই সংখ্যা বাস্তবে কাছাকাছিও পৌঁছে, তাহলে এটি বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় শোকসমাবেশগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হবে।
শুধু তেহরান নয়, ইরান ও ইরাকের পাঁচটি শহরে ছয় দিনব্যাপী কর্মসূচির মাধ্যমে আয়াতুল্লাহ খামেনির বিদায় আয়োজন করা হচ্ছে। শাহাদাতের ১৩১ দিন পর এই দাফন অনুষ্ঠান কেন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তা নিয়েও দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
১৩১ দিন পর কেন জানাজা?
আয়াতুল্লাহ খামেনি ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার প্রথম দিনে শাহাদাত বরণ করেন বলে সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে। কিন্তু তার দাফন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৯ জুলাই, অর্থাৎ প্রায় ১৩১ দিন পর।
ইসলামি বিধানে মৃত্যুর পর দ্রুত দাফনের নির্দেশনা থাকলেও ইরানি কর্তৃপক্ষ বলছে, এই বিলম্বের পেছনে ছিল একাধিক ব্যতিক্রমী কারণ।
প্রথমত, হামলার পর ইরান কার্যত যুদ্ধাবস্থার মধ্যে প্রবেশ করে। বিমান হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ এবং নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে কোটি মানুষের জনসমাগম আয়োজন করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, সর্বোচ্চ নেতার জানাজায় দেশ-বিদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমনের সম্ভাবনা থাকায় নিরাপত্তা, আবাসন, পরিবহন এবং জননিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়।
তৃতীয়ত, নেতার শাহাদাতের পর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও সরকারের জন্য একটি অগ্রাধিকার ছিল।
এ ছাড়া একই হামলায় শহীদ পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ এবং বহুদেশীয় কর্মসূচির প্রস্তুতিও সময় নিয়েছে।
কোমের একাধিক ফিকহ বিশেষজ্ঞের মতে, যুদ্ধ ও নিরাপত্তাজনিত বিশেষ পরিস্থিতিতে জনস্বার্থ এবং মানুষের জীবন রক্ষার স্বার্থে দাফন বিলম্বিত হওয়া ইসলামী শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
বিশ্বের নজর তেহরানের দিকে
ইরানের রাষ্ট্রীয় ও জনপ্রিয় সংগঠনগুলো এই অনুষ্ঠানকে শুধু একটি জানাজা হিসেবে নয়, বরং জাতির ঐক্য, প্রতিরোধের চেতনা এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছে।
ইরানের নীতি নির্ধারণী পরিষদের সদস্য গোলাম আলী হাদ্দাদ আদেল বলেছেন, শহীদ নেতার জানাজা সাম্প্রতিক শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা। তাঁর মতে, লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতি বিশ্বের কাছে ইসলামি শাসনব্যবস্থা ও ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি ইরানি জনগণের সমর্থনের একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করবে।
তিনি বলেন, আয়াতুল্লাহ খামেনির সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক ছিল কেবল রাষ্ট্রীয় বা আইনি সম্পর্ক নয়; বরং ভালোবাসা, বিশ্বাস, ধর্মীয় আস্থা ও আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক গভীর বন্ধন।
অনুষ্ঠানের আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানী তেহরানের প্রধান শোকযাত্রাতেই দুই কোটির কাছাকাছি মানুষের অংশগ্রহণ হতে পারে। অন্যদিকে চূড়ান্ত দাফন অনুষ্ঠানে মাশহাদে আরও ৮০ লাখ থেকে এক কোটি মানুষের উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে।
ছয় দিনে পাঁচ শহর
শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ইরান ও ইরাকে বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ৪ ও ৫ জুলাই তেহরানের ইমাম খোমেনী গ্র্যান্ড মোসাল্লায় বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। ৬ জুলাই রাজধানীতে প্রধান শোকযাত্রা ও জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ৭ জুলাই কোমে দ্বিতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান, ৮ জুলাই ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় শোকানুষ্ঠান এবং ৯ জুলাই মাশহাদে ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারের কাছে চূড়ান্ত দাফন সম্পন্ন হবে।
ইরানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক উপমন্ত্রী এবং শহীদ নেতার বিদায় ও জানাজা অনুষ্ঠানের জাতীয় কমিটির মহাসচিব আলী আকবর পুরজামশিদিয়ান জানিয়েছেন, ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফের নেতৃত্বে ‘উম্মাহর মহান নেতার বিদায় ও জানাজা আয়োজন জাতীয় কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ কমিটির সচিবালয়ের দায়িত্ব পালন করছে। অনুষ্ঠান বাস্তবায়নের জন্য সহায়তা, নিরাপত্তা, অবকাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম, আন্তর্জাতিক বিষয়কসহ একাধিক বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ইরাকেও প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে বাগদাদে দেশটির প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্ট স্পিকার এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় সম্পন্ন করেছেন।
এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ‘উত্থিত হও’ এবং আরবি স্লোগান ‘কূমু লিল্লাহ’ (আল্লাহর জন্য দাঁড়াও)।
তেহরানের মোসাল্লায় নির্মিত মূল মঞ্চটিও বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। আয়োজক কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসানজাদেহ জানিয়েছেন, মঞ্চটির উচ্চতা, অবস্থান ও নকশা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে প্রাঙ্গণের প্রতিটি অংশ থেকে তা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় শহীদ নেতার ব্যবহৃত মঞ্চের আদলে পরিবেশ পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে এবং জানাজার নামাজের পুরো আয়োজনও এই নকশার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নজিরবিহীন নিরাপত্তা ও ট্রাফিক পরিকল্পনা
দুই কোটির সমাবেশের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে তেহরানে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থা।
তেহরান ট্রাফিক পুলিশের প্রধান সাইয়্যেদ আবুলফজল মুসাভিপুর জানিয়েছেন, রাজধানীর ১৪টি প্রবেশপথে প্রায় ১২ লাখ পার্কিং স্থান প্রস্তুত করা হয়েছে। শহরের বিভিন্ন মহাসড়ক, সরকারি ও বেসরকারি পার্কিং এলাকা এবং খোলা জায়গাগুলোকে অস্থায়ী পার্কিং হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
আয়োজকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মেট্রো ব্যবহার করবেন, যা সংখ্যায় ৫০ লাখেরও বেশি। মেট্রোর সক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের জন্য শত শত বাস প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এ উপলক্ষে তেহরান, কোম ও মাশহাদে বিশেষ সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তেহরানে অনুষ্ঠান চলাকালে মেট্রো ২৪ ঘণ্টা এবং বাসসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পরিচালিত হবে। অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জানাজার প্রধান রুট হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে দামাভান্দ, ইনকিলাব, আজাদি এবং শহীদ লাশগারি সড়ক। এসব সড়কের আশপাশে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় পর্যায়ক্রমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে এবং ভারী যানবাহন প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে।
নিরাপত্তা ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), বাসিজ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা। তেহরানের ২২টি পৌর অঞ্চল দেশের ৩১টি প্রদেশ থেকে আগত শোকাহতদের আবাসনের দায়িত্ব নিয়েছে। মসজিদ, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্রীড়া কমপ্লেক্সগুলোকে অস্থায়ী আবাসনকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মাত্রা
এই আয়োজনের আন্তর্জাতিক গুরুত্বও নজরকাড়া। আয়োজক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি, বিভিন্ন ধর্ম ও মাযহাবের শীর্ষ নেতা, আলেম, চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে ৩০টিরও বেশি দেশ ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধি পাঠানোর আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। এত বিপুল আন্তর্জাতিক উপস্থিতি এই আয়োজনকে শুধু জাতীয় শোকানুষ্ঠান নয়, একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমিক ঘটনাতেও পরিণত করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও সরকারি প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইতোমধ্যে সরকারি প্রতিনিধিদল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলও অনুষ্ঠানে অংশ নেবে বলে জানা গেছে।
বিশ্ব গণমাধ্যমের আগ্রহও ব্যাপক। আয়োজক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, জানাজা ও দাফন কর্মসূচি কভার করার জন্য ইতোমধ্যে ৩০০-এর বেশি বিদেশি সাংবাদিক, আলোকচিত্রী ও গণমাধ্যমকর্মী নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ইরানে অনুষ্ঠিত কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এত বড় আন্তর্জাতিক মিডিয়া উপস্থিতি বিরল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মতো তার বিদায়ও এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ, নিরাপত্তা সংকট, রাষ্ট্রীয় রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে ১৩১ দিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাঁর জানাজা ও দাফন।
কিন্তু এই আয়োজনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো সম্ভাব্য জনসমাগম। আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী, তেহরানে দুই কোটি মানুষের উপস্থিতি ঘটলে তা শুধু ইরানের ইতিহাস নয়, বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় শোকসমাবেশগুলোর একটিতে পরিণত হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে ৯০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি, বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং শত শত আন্তর্জাতিক সাংবাদিকের উপস্থিতি।
ফলে আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজা কেবল একটি রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও গণসমাবেশ হিসেবেও ইতিহাসে স্থান পেতে পারে। আর সেই সমাবেশের মাধ্যমে ইরান বিশ্বকে দেখাতে চাইবে যে, তাদের দৃষ্টিতে খামেনেয়ী কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি আদর্শ, একটি প্রতিরোধের প্রতীক এবং কোটি মানুষের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সামরিক হামলার প্রথম দিনে আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী শহীদ হন। ওই হামলায় কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা এবং বহু বেসামরিক নাগরিকও প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে মিনাব শহরের কয়েকজন স্কুলশিক্ষার্থীও ছিল। এর জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৪’-এর আওতায় একাধিক ধাপে পাল্টা হামলা চালায় বলে জানানো হয়েছে।