Image description

যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব বা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (বার্থরাইট সিটিজেনশিপ) সীমিত করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারি করা নির্বাহী আদেশ বাতিল করে দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার এক ঐতিহাসিক রায়ে সর্বোচ্চ আদালত পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, মার্কিন ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া যেকোনও ব্যক্তিই দেশটির নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন।

অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কারা মার্কিন নাগরিকত্বের যোগ্য হবেন, তা সুনির্দিষ্ট করে দিতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে ট্রাম্পের সেই অভিবাসন নীতির ওপর একটি বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আদালতের পাঁচ বিচারকের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে লেখা রায়ে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, নাগরিকত্ব হলো অধিকার পাওয়ার অধিকার, যার মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক কমিউনিটিতে স্বাধীনভাবে অংশ নেওয়া যায়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ বা সাময়িকভাবে অবস্থান করা পিতা-মাতার ঘরে জন্ম নেওয়া সন্তানরাও মার্কিন ‘এখতিয়ারের অধীন’ (সাবজেক্ট টু দ্য জুরিসডিকশন) এবং সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারা অনুযায়ী তারা জন্মসূত্রেই নাগরিক।

তবে এই রায়ের বিপক্ষে ভিন্নমত পোষণ করেছেন রক্ষণশীল বিচারপতি ক্লারেন্স টমাস। তিনি তার ভিন্নমতের নোটে লিখেছেন, নাগরিক অধিকার আইন এবং নাগরিকত্ব ধারা উভয়ই বর্ণ নির্বিশেষে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এবং বসবাসকারী ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের গ্যারান্টি দেয়। যেহেতু প্রেসিডেন্টের আদেশের অনেক সম্ভাব্য প্রয়োগই নাগরিকত্ব ধারার মূল জনার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, তাই আমি সম্মান জানিয়ে এই রায়ের বিরোধিতা করছি।

 

যদি ট্রাম্প প্রশাসন আদালতে নিজেদের যুক্তি প্রমাণে সফল হতো, তবে লাখ লাখ শিশু মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্যতা হারাতো। এর ফলে তারা কাজের অনুমতি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধা এবং ভোটাধিকারসহ মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত হতো। এমনকি পিতা-মাতার নিজ দেশ যদি সেই শিশুদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করদো, তবে তাদের অনেকেই সম্পূর্ণ অধিকারহীন ‘রাষ্ট্রহীন’ নাগরিক বা ভাসমান জনগোষ্ঠীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ত।

এই রায় ঘোষণার আগেই অবশ্য নিজের নিযুক্ত দুই বিচারপতি নীল গোরসুচ এবং অ্যামি কোনি ব্যারেটের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ক্ষোভ ঝেড়েছিলেন ট্রাম্প। তারা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারেন, এমনটা আঁচ করতে পেরে ট্রাম্প লিখেছিলেন, আমি ব্যক্তিগত আনুগত্য চাই না, তবে আমি আমাদের দেশের জন্য এটা চাই এবং প্রত্যাশা করি।

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা, যাদের পিতা-মাতার অন্তত একজন বৈধভাবে সেখানে বসবাস করছেন। ট্রাম্পের এই আদেশটি মূলত একসময়কার চরমপন্থি একটি আইনি অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। ওই তত্ত্বে দাবি করা হয়, যারা আমেরিকায় অবৈধভাবে অবস্থান করছেন, তারা দেশটির ‘এখতিয়ারের অধীন’ নন; ফলে সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না। তবে মামলার প্রাথমিক শুনানির সময়ই প্রধান বিচারপতি রবার্টসসহ অধিকাংশ বিচারপতি ট্রাম্প প্রশাসনের এই যুক্তির প্রতি তীব্র সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের দুই-তৃতীয়াংশ নাগরিক সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে পাওয়া এই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার বজায় রাখার পক্ষে। এই সমর্থকদের মধ্যে সিংহভাগ স্বতন্ত্র রাজনীতির অনুসারী এবং অনেক রিপাবলিকানও রয়েছেন। এমনকি ট্রাম্পের সবচেয়ে কট্টর ও ধর্মীয় ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল প্রোটেস্ট্যান্টদেরও প্রায় ৫৩ শতাংশ সংবিধানে নিশ্চিত করা এই অধিকারকে সমর্থন করেন।

সূত্র: অ্যাক্সিওস