তুরস্ক প্রায়শই নিজেকে ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং মুসলিম সংহতির প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির ঐতিহাসিক সম্পর্ক বেশ জটিল বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তুরস্কের অবস্থান
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তুরস্ক বাঙালি জনগণের পক্ষে দাঁড়ায়নি।
এই বিলম্ব তুরস্কের কৌশলগত অগ্রাধিকারের দিকেই ইঙ্গিত করে। স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার নিরাপত্তা জোট এবং মুসলিম বিশ্বের বিস্তৃত রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে পাকিস্তান ছিল তুরস্কের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ফলে আঙ্কারার কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামকে সমর্থনের চেয়ে ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
ওআইসি এবং বাংলাদেশের সদস্যপদ
ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)-তে বাংলাদেশের সদস্যপদ অর্জনের ক্ষেত্রে তুরস্ক বাংলাদেশের পক্ষে কোনো সক্রিয় ভূমিকা রাখেনি। বরং পাকিস্তান তাদের অবস্থান পরিবর্তন করার পরই আঙ্কারা বাংলাদেশের সদস্যপদ মেনে নেয়।
অনেক বাংলাদেশির কাছে এই ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম আজও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব দেশ সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল, জাতীয় স্মৃতিতে স্বাভাবিকভাবেই তারা ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। তাদের তুলনায় যারা ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা অনিবার্য হয়ে ওঠার পর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, তাদের অবস্থান আলাদা।
জামায়াতে ইসলামী এবং তুরস্ক
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতার বিরোধিতা করে এবং পাকিস্তানের পক্ষ নেয়। দলটির শীর্ষ নেতারা পাকিস্তানের সামরিক সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সহযোগিতা করেন। পরবর্তীকালে তাদের কয়েকজনকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাংলাদেশের আদালত দোষী সাব্যস্ত করেন।
১৯৭১ সালে তুরস্ক সরাসরি জামায়াতে ইসলামীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল—এমন বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করায় কার্যত তুরস্কও সেই একই পক্ষের সঙ্গে অবস্থান নিয়েছিল, যে পক্ষের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ছিল।
এরদোয়ানের তুরস্ক ও জামায়াতে ইসলামী
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আমলে তুরস্ক-বাংলাদেশ সম্পর্কের এই অধ্যায় নতুন মাত্রা পায়। ২০১০-এর দশক থেকে তুরস্ক বারবার বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) কার্যক্রমের সমালোচনা করে। পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর একাধিক নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার আহ্বান জানায়। তুর্কি কর্মকর্তারা এসব বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তারা দণ্ডপ্রাপ্তদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ভিন্ন। সরকারের মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত নৃশংস মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বহু প্রতীক্ষিত বিচার নিশ্চিত করতেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এসব বিচার সম্পন্ন করা হয়েছে।
তুরস্ক, মুসলিম ব্রাদারহুড এবং জামায়াতে ইসলামী
প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) সরকার সাধারণত ‘রাজনৈতিক ইসলাম’-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম ব্রাদারহুড দ্বারা প্রভাবিত সংগঠনগুলোর প্রতি তাদের এই অনুকম্পা আরো প্রকট।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং মুসলিম ব্রাদারহুড দু’টি পৃথক সংগঠন। তাদের ইতিহাস, উৎপত্তি ও জাতীয় প্রেক্ষাপটও ভিন্ন। জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে আবুল আ'লা মওদুদীর চিন্তাধারার ওপর। অন্যদিকে মুসলিম ব্রাদারহুডের জন্ম মিশরে হাসান আল-বান্নার নেতৃত্বে।
তবে গবেষকরা দু’টি সংগঠনের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদর্শিক মিলের কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে—ইসলাম ও রাজনীতির সমন্বয়, ইসলামী নীতিমালাভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার পক্ষে অবস্থান, তৃণমূলভিত্তিক সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ এবং বিভিন্ন দেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার ধারণা।
এসব আদর্শিক সাদৃশ্যের কারণে তুরস্কের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের কিছু ব্যক্তিত্ব এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন যে, তুরস্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতের প্রতি সংযত রাজনৈতিক সহানুভূতি প্রকাশ করেছে। যদিও সরাসরি নির্বাচনী সহায়তার প্রমাণ নেই। তবে বিশ্লেষকদের মতে কিছু তুর্কি প্রতিষ্ঠান সোশ্যাল মিডিয়া প্রচার এবং নির্বাচনি তহবিল সরবরাহে জামায়াতকে সাহায্য করেছে।
তবে, তুর্কি সরকারের সরাসরি সম্পৃক্ততার দাবিগুলো যথাযথ তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণাদির মাধ্যমে সমর্থন করা প্রয়োজন।
ইতিহাসের প্রভাব
বাংলাদেশে তুরস্কের নীতিগত অবস্থান ইতিহাসের স্মৃতিকে প্রভাবিত করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানপন্থী অবস্থান এবং পরবর্তীতে জামায়াত নেতাদের সমর্থন আজও বাংলাদেশের জনগণের কাছে বিতর্কিত।
একই সময়ে, দুই দেশ নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা এবং মানবিক খাতে সহযোগিতা প্রসারিত করেছে। সুতরাং, অমীমাংসিত ঐতিহাসিক মতবিরোধের পাশাপাশি আধুনিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও বিদ্যমান আছে।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—কিভাবে কার্যকর সহযোগিতা বাড়ানো যায় এবং একই সঙ্গে ইতিহাসের বাস্তবতা স্বীকার করা যায়। প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে ইতিহাসকে উপেক্ষা না করে, বরং তা স্বচ্ছ ও সম্মানজনকভাবে মোকাবেলা করে।