Image description

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যমের অতি-উদ্বেগপ্রকাশ ও হইচইয়ের প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত দৈনিক গ্লোবাল টাইমস। বুধবার (২৪ জুন) থেকে শুরু হওয়া এই তিনদিনের সরকারি সফরে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন হতে যাচ্ছে বলে পত্রিকাটির এক সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে।

দায়িত্বগ্রহণের পর এটিই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চীন সফর। গ্লোবাল টাইমসের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, নতুন বাংলাদেশি সরকারের এই তাৎপর্যপূর্ণ সফরসূচি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঢাকার উচ্চ অগ্রাধিকারকেই প্রতিফলিত করে। এই সফরে দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, যা বেইজিং ও ঢাকার মধ্যে গভীর রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনাকে প্রমাণ করে।

বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও চীনের ভূমিকা

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই মুহূর্তে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর করা বাংলাদেশের জন্য প্রধান অগ্রাধিকার।

এমন পরিস্থিতিতে টানা ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, যা লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। এছাড়া ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে চীন বাংলাদেশকে শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ায় দেশটিতে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামোগত সহযোগিতা, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং কৌশলগত সংলাপের ওপরই মূল জোর দেওয়া হচ্ছে বলে সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেশীদের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক

গ্লোবাল টাইমস মনে করে, বাংলাদেশের এই সফর মূলত এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক গভীর হওয়ারই একটি অংশ। সম্প্রতি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট তো লাম, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমন এবং ব্রুনাইয়ের যুবরাজ হাজি আল-মুহতাদী বিল্লাহ চীন সফর করেন। দালিয়ানের আসন্ন সামার ডাভোস ফোরামেও ওই অঞ্চলের শীর্ষ নেতারা সমবেত হচ্ছেন। এই উচ্চপর্যায়ের সফরগুলো প্রমাণ করে যে প্রতিবেশী দেশগুলো চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ কাজে লাগাতে অত্যন্ত আগ্রহী।

ভারতের ‘দাদাগিরি মানসিকতা’ ও চীনের অবস্থান

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয় এবং এটি অন্য কোনো দেশের মাধ্যমে প্রভাবিত হওয়া উচিত নয় বলে স্পষ্ট জানিয়েছে বেইজিং। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একাংশ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে ভারতকে বেছে না নিয়ে চীনকে নির্বাচন করায় অসন্তোষ প্রকাশ করে। কোনো কোনো ভারতীয় বিশ্লেষক একে ভারতের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে দেখছেন। আবার তিস্তা নদীর পানিবণ্টন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা নিয়ে সংবেদনশীলতা দেখাচ্ছে নয়াদিল্লি।

গ্লোবাল টাইমসের সম্পাদকীয়তে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এই অবস্থানকে ‘দাদাগিরি মানসিকতা’ (Big Brother Mentality) হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ভারতের কিছু অংশ মনে করে প্রতিবেশী দেশের নেতাদের প্রথম সফরটি আঞ্চলিক অভিভাবকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের নিদর্শন হওয়া উচিত। তারা অন্য দেশের স্বাধীন কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিজেদের প্রতি অবমাননা হিসেবে ধরে নেয়।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়, পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে বাস্তব সহযোগিতাও গড়ে তুলতে আগ্রহী। চীন ও ভারতের উচিত পারস্পরিক বন্ধু ও অংশীদার হিসেবে কাজ করা, যাকে প্রায়ই ‘ড্রাগন-এলিফ্যান্ট ট্যাঙ্গো’ বা ড্রাগন ও হাতির যৌথ নৃত্য বলা হয়। একই সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতিকেও স্বাগত জানায় বেইজিং। এই সম্পর্কগুলো একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, কোনোভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।

তিস্তা প্রকল্প নিয়েও ভারত, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করে বেইজিং। গ্লোবাল টাইমস উল্লেখ করেছে, দক্ষিণ এশিয়ার আকাশ এতটাই বিশাল যে সেখানে সব দেশের বাস্তবমুখী উন্নয়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতার সমান সুযোগ রয়েছে।

সূত্র: গ্লোবাল টাইমস