Image description

পাকিস্তান নিজেকে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে ভালোবাসে। রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কেন্দ্রেই ইসলাম, রাজনৈতিক বক্তৃতায় ইসলাম, পররাষ্ট্রনীতিতে মুসলিম ঐক্যের আহ্বান এবং আন্তর্জাতিক নানা ইস্যুতে মুসলিম উম্মাহর প্রতিনিধিত্বের দাবি—সব মিলিয়ে দেশটির আত্মপরিচয়ের বড় অংশজুড়েই রয়েছে ধর্মীয় বয়ান। কিন্তু সেই পাকিস্তানই এখন মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর কাছে বিব্রতকর এক পরিচয়ে আলোচিত হচ্ছে—ভিক্ষুক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে।

গতকাল সোমবার (২২ জুন) পাকিস্তানের পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরীর দেওয়া তথ্য নতুন করে সেই বিতর্ককে সামনে এনেছে। তিনি জানিয়েছেন, শুধু সৌদি আরবেই ৫ হাজার ৫০০ পাকিস্তানি ভিক্ষুক আটক হয়েছেন। একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতও। বিষয়টি শুধু কয়েক হাজার মানুষের ভিক্ষাবৃত্তির ঘটনা নয়; বরং এটি পাকিস্তানের অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির গভীর সংকটের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সৌদি আরব পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের মিত্র। অর্থনৈতিক সংকটের সময় বহুবার ইসলামাবাদকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে রিয়াদ। তেল সরবরাহ থেকে শুরু করে ঋণ সুবিধা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়েছে দেশটি। কিন্তু সেই সৌদি আরব যখন পাকিস্তানকে জানায় যে হাজার হাজার পাকিস্তানি নাগরিক ভিক্ষাবৃত্তির অভিযোগে আটক হয়েছেন, তখন তা নিঃসন্দেহে কূটনৈতিক অস্বস্তির বিষয়।

তালাল চৌধুরীর বক্তব্যে হতাশার সুরও স্পষ্ট ছিল। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, সৌদি আরব, বা সংযুক্ত আরব আমিরাত যখন এসব ভিক্ষুকের ব্যাপারে পাকিস্তানের কাছে জবাব চায়, তখন ইসলামাবাদের বলার কী থাকে? প্রশ্নটি শুধু একজন মন্ত্রীর নয়; এটি আজকের পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংকটের প্রতিচ্ছবি।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো দেখলে বোঝা যায়, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বাস্তবতা গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে খারাপ হয়েছে। রয়টার্স একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, দেশটি বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণের চাপ, জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে। আইএমএফের সহায়তা ছাড়া অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক বিশ্লেষণে বলেছে, দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বাড়লেও কর্মসংস্থান সেই অনুপাতে সৃষ্টি হয়নি। ফলে লাখ লাখ তরুণ বিদেশমুখী হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের জন্য একটি বড় আশ্রয়স্থল। কিন্তু বৈধ শ্রমবাজারের পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসন ও ভিক্ষাবৃত্তির নেটওয়ার্কও গড়ে উঠেছে।

পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদপত্র ডন কয়েক বছর ধরেই এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছে। পত্রিকাটির বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশটির কিছু এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তি একটি সংগঠিত ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মৌসুমকে লক্ষ্য করে কিছু চক্র দরিদ্র মানুষকে বিদেশে পাঠায়। সেখানে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা হয়।

অনেক ক্ষেত্রে ভিক্ষাবৃত্তি আর ব্যক্তিগত দারিদ্র্যের বিষয় থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের অংশ। মানবপাচার, ভিসা জালিয়াতি, অবৈধ অভিবাসন এবং ভিক্ষাবৃত্তি—সব মিলিয়ে একটি সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে ওঠে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উদ্বেগও অমূলক নয়। সৌদি আরব বর্তমানে তাদের অর্থনীতিকে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করছে। ‘ভিশন ২০৩০’-এর মাধ্যমে দেশটি পর্যটন, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে। ফলে বিদেশি ভিক্ষুকদের উপস্থিতি তাদের জন্য শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, ভাবমূর্তির বিষয়ও।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই অবস্থানে রয়েছে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি শ্রমিকনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুললেও অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। পাকিস্তানি নাগরিকদের ভিসা প্রদানে অতীতে যে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল, তার পেছনে নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশাপাশি ভিক্ষাবৃত্তি ও আইনভঙ্গের অভিযোগও ছিল বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু এই সংকটের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হয়তো অন্য জায়গায়। পাকিস্তান নিজেকে ইসলামের দুর্গ হিসেবে উপস্থাপন করে। রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছিল মুসলমানদের জন্য আলাদা আবাসভূমির দাবির ভিত্তিতে। দেশটির রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই ইসলামী মূল্যবোধের কথা বলে। কিন্তু ইসলাম নিজেই ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করে।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি মানুষের কাছে হাত পাতে, সে কিয়ামতের দিন অপমানিত অবস্থায় উঠবে। মহানবী মুহাম্মদ (সা.) নিজের পরিশ্রমে জীবিকা অর্জনকে মর্যাদাপূর্ণ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এমনকি পাহাড় থেকে কাঠ কেটে এনে বিক্রি করাকেও মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে উত্তম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসলামের সামাজিক অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হলো জাকাত। এর উদ্দেশ্যই হচ্ছে এমন একটি সমাজ গঠন করা, যেখানে মানুষকে ভিক্ষা করতে না হয়। সুতরাং কোনো মুসলিম রাষ্ট্র যদি এমন অবস্থায় পৌঁছে যে হাজার হাজার নাগরিক বিদেশে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেটি শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়; ইসলামী কল্যাণরাষ্ট্রের দাবির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক বাস্তবতা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেনের মতে, “যে রাষ্ট্র নাগরিকদের ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, সেখানে ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং সুশাসনই রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে।”

পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ ড. কাইজার বাঙালিও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোচনায় বলেছেন, পাকিস্তানের সংকট মূলত কাঠামোগত। উৎপাদনশীল শিল্পখাতের দুর্বলতা, কর ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, শিক্ষা ও দক্ষতার ঘাটতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি বহু বছর ধরে অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বললেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেনি। ফলে সংকট একের পর এক ফিরে এসেছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছেন সাধারণ পাকিস্তানি প্রবাসীরা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং ওমানে কর্মরত লাখো পাকিস্তানি বৈধভাবে কাজ করছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স পাকিস্তানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু কিছু সংগঠিত চক্রের কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো দেশের শ্রমশক্তিকে সন্দেহের চোখে দেখা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এই বৈধ কর্মীরাই।

এ কারণেই সৌদিতে ৫ হাজার ৫০০ পাকিস্তানি ভিক্ষুক আটকের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো আইনশৃঙ্খলা সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো, অভিবাসন নীতি, শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় সংকেত।

পাকিস্তান আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে ইসলামের নামে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া তুলনামূলক সহজ, কিন্তু নাগরিকদের জন্য সম্মানজনক জীবিকা নিশ্চিত করা কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যে প্রশ্ন আজ ইসলামাবাদের সামনে তুলছে, সেটি মূলত আরও গভীর একটি প্রশ্ন—কেন এমন একটি রাষ্ট্র, যা মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখে, তার হাজার হাজার নাগরিককে বিদেশের মাটিতে ভিক্ষা করতে যেতে হচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পেলে পাকিস্তানের জন্য সংকট আরও বাড়বে। কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো দেশের মর্যাদা নির্ধারিত হয় না তার বক্তৃতা দিয়ে; নির্ধারিত হয় তার নাগরিকদের বাস্তব জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান এবং সম্মানজনক অবস্থানের মাধ্যমে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাকিস্তানি ভিক্ষুকদের উপস্থিতি সেই বাস্তবতারই নির্মম স্মারক হয়ে উঠেছে।