Image description

দশকের পর দশক ধরে বৈশ্বিক তেলের বাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাপ্রবাহের ওপর নির্ভর ছিল। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, ওপেকের (তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা) সিদ্ধান্ত এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা প্রায়শই অপরিশোধিত তেলের দামের গতিপথ নির্ধারণ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানি বাণিজ্যের রুট পুনর্গঠিত হওয়ায় রাশিয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

 

তবে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক তেল সংকট একটি অপ্রত্যাশিত বাস্তবতা সামনে এনেছে। এ সংকটে তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় প্রভাব বিস্তারকারী দেশটি কোনো আলোচনার টেবিলে ছিল না। সেটি হলো চীন।
ওয়াশিংটন ও তেহরান যখন স্থায়ী সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং স্বাভাবিক তেল সরবরাহ পুনঃস্থাপনের বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে, তখন বিশ্লেষকরা ক্রমেই বেইজিংকে এমন এক খেলোয়াড় হিসেবে দেখছেন, যে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক তেল বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

এর কারণও স্পষ্ট। চীন এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘সুইং বায়ার’ বা চাহিদা অনুযায়ী ক্রয় বাড়ানো-কমানোর সক্ষমতাসম্পন্ন ক্রেতা এবং ক্রমশ জ্বালানির সবচেয়ে বড় ‘সুইং অ্যাবজর্বার’ বা বাজারের অতিরিক্ত সরবরাহ শোষণকারী শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

যে সংকটে তেলের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ার কথা ছিল

ইরান যুদ্ধ চলাকালে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিন ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি তেল সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়ে। এতে বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল প্রবাহের প্রায় এক পঞ্চমাংশ প্রভাবিত হয়।

ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে, এমন ধাক্কা তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটানোর কথা। ১৯৭৩ সালের আরব তেল অবরোধের সময় বৈশ্বিক সরবরাহের মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ ব্যাহত হয়েছিল, কিন্তু তেলের দাম সেই সময় ১৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যায়।
এবার সরবরাহে বিঘ্ন আরও বড় হলেও তেলের দাম বাড়লেও তা ২০০ ডলার প্রতি ব্যারেলের মতো ভয়াবহ পূর্বাভাসের কাছাকাছিও পৌঁছায়নি।
ভারতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্রান্ট থর্নটন ভারতের তেল ও গ্যাসবিষয়ক অংশীদার সৌরভ মিত্র মনে করেন, এর পেছনে জরুরি পদক্ষেপ নয়, বরং চীনের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিই মূল ভূমিকা রেখেছে।

তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ হরমুজ প্রণালিকে কার্যত সংকুচিত করে বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ সরিয়ে দিয়েছিল। বিশ্ব আরও বড় ধাক্কার আশঙ্কা করছিল। কিন্তু এর প্রভাব তুলনামূলক সীমিত থাকার কারণ ছিল চীনের নীরব পুনঃসমন্বয়।

কম কিনেই পরিস্থিতি সামাল দিলো চীন
এই পুনঃসমন্বয় একদিনে হয়নি। কয়েক বছর ধরেই চীন রাশিয়া ও ইরান থেকে ছাড়মূল্যে তেল কিনে বিশাল মজুত গড়ে তুলেছে। ধারণা করা হয়, দেশটির কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুতে বর্তমানে ১০০ কোটিরও বেশি ব্যারেল তেল রয়েছে।
সংকটের সময় নতুন করে বাজারে ঝাঁপিয়ে না পড়ে চীনা শোধনাগারগুলো নিজেদের মজুত থেকে তেল ব্যবহার করেছে। একই সঙ্গে চীন অপরিশোধিত তেল আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।

বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, সংকটকালীন সময়ে চীনের তেল আমদানি দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল কমে যায়।

সৌরভ মিত্র বলেন, চীন শুধু কম কিনেছে। তারা প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল আমদানি কমানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে এবং প্রয়োজনের সময় কার্যত সেই তেল বিশ্ববাজারের জন্য উন্মুক্ত রেখেছে।

এর ফলে যখন বিশ্ব সরবরাহ চাপে ছিল, তখন একটি বড় উৎস থেকে চাহিদা কমে যায়। এতে তেলের দামের আরও তীব্র উল্লম্ফন ঠেকানো সম্ভব হয়েছে।

বৈদ্যুতিক গাড়ি ও দুর্বল শোধন চাহিদার প্রভাব
চীনের প্রভাব শুধু কৌশলগত মজুতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশটিতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের দ্রুত প্রসার তেলের চাহিদা কমিয়ে আনছে। বর্তমানে চীনে বিক্রি হওয়া নতুন যাত্রীবাহী গাড়ির প্রায় অর্ধেকই বৈদ্যুতিক অথবা হাইব্রিড। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গত বছর শুধু চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির বহরই প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেলের চাহিদা প্রতিস্থাপন করেছে।

একই সময়ে বেইজিং জ্বালানি রপ্তানির কোটা সীমিত করেছে এবং শোধনাগারগুলো উৎপাদন কমিয়েছে। ফলে অতিরিক্ত অপরিশোধিত তেল কেনার প্রয়োজনও হ্রাস পেয়েছে।
এই সব কারণ মিলিয়ে বিশ্লেষকরা চীনকে তেলবাজারের এক ধরনের “অদৃশ্য হাত” হিসেবে বর্ণনা করছেন।
সংকটের সময় দুর্লভ তেলের জন্য প্রতিযোগিতায় না নেমে চীন পেছনে সরে দাঁড়িয়েছে, যা ভারতসহ আমদানি নির্ভর দেশগুলোর জন্য স্বস্তি এনে দিয়েছে।

আবারও বড় ক্রেতা হয়ে ফিরতে পারে চীন
তবে পরিস্থিতি বদলাতেও পারে। সংকট মোকাবিলায় ব্যবহৃত বিশাল মজুত একসময় পুনরায় পূরণ করতে হবে। সৌরভ মিত্রের মতে, যদি তেলের দাম আরও কমে, তাহলে চীন আবার বড় ক্রেতা হিসেবে বাজারে ফিরতে পারে। সংকটকালে ব্যবহৃত মজুত শেষ পর্যন্ত পুনরায় পূরণ করতেই হবে।
হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি চালু হলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, ২০২৭ সালের মধ্যে বাজারে ঘাটতির আশঙ্কা থেকে উল্টো অতিরিক্ত সরবরাহের উদ্বেগ দেখা দিতে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর অতিরিক্ত উৎপাদন এবং ইরানের রপ্তানি বৃদ্ধি বাজারে বিপুল পরিমাণ তেল নিয়ে আসতে পারে। তবে সেই অতিরিক্ত সরবরাহ বাজারে চাপ সৃষ্টি করবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে চীনের ক্রয় সিদ্ধান্তের ওপর।
যদি বেইজিং দ্রুত মজুত পুনর্গঠন শুরু করে, তাহলে অতিরিক্ত তেলের বড় অংশ সহজেই বাজার থেকে শোষিত হতে পারে। আর যদি তা না করে, তাহলে অপরিশোধিত তেলের দামের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।

ভারতের জন্য কী শিক্ষা
ভারতের জন্য এ পরিস্থিতি একদিকে স্বস্তির, অন্যদিকে শিক্ষণীয়। তুলনামূলক কম তেলের দাম ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে চীনের আমদানি কমানোর সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে সৌরভ মিত্র মনে করেন, ভারতের উচিত নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা। তার মতে, ভারত ইতিমধ্যে সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করেছে এবং কৌশলগত মজুত তৈরিতেও দক্ষতা দেখিয়েছে। তবে এখনও পরিসরের ঘাটতি রয়েছে।

তার ভাষায়, যেসব দেশের কৌশলগত মজুত মাস নয়, মাত্র কয়েক সপ্তাহের চাহিদা মেটাতে সক্ষম, তারা নিজেরা বাজারকে প্রভাবিত করার বদলে অন্যদের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হয়।”

নতুন তেল পরাশক্তি কি চীন
দীর্ঘদিন ধরে তেল ব্যবসায়ীরা রিয়াদ, মস্কো ও ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়ে বাজারের দিকনির্দেশনা খুঁজেছেন। কিন্তু এখন তাদের বেইজিংয়ের দিকেও সমান মনোযোগ দিতে হতে পারে।

তেল আমদানি দ্রুত কমিয়ে আনা, বিশাল মজুত ব্যবহার করা, বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার ত্বরান্বিত করা এবং প্রয়োজন হলে আবার বৃহৎ ক্রেতা হিসেবে বাজারে ফিরে আসার ক্ষমতা চীনকে এমন এক প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে, যা খুব কম দেশেরই রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক তেলবাজারের পরবর্তী বড় পরিবর্তন হয়তো আর পারস্য উপসাগর থেকে যাত্রা করা কোনো ট্যাংকারের মাধ্যমে নয়, বরং বেইজিংয়ে নেয়া একটি ক্রয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।