Image description

ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলের ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা হামলার পর অবশেষে থেমেছে যুদ্ধ। দুই পক্ষই নিজেদের ‘জয়ী’ দাবি করে চুক্তিতে সই করেছে। তবে এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ থামলেও কূটনৈতিক যুদ্ধটা কেবল শুরু হতে যাচ্ছে।

উভয় দেশই এই চুক্তিকে নিজ নিজ জনগণের কাছে বড় এক ‘বিজয়’ হিসেবে প্রমাণ করতে মরিয়া। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো পক্ষই নিজ দেশের মানুষকে পুরোপুরি আশ্বস্ত করতে পারেনি।

এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান কেবল যুদ্ধই থামায়নি, বরং লাভবান হবে রাজনৈতিকভাবে। তেহরান এখন বলতে পারছে, শত্রুর সামনে তারা মাথা নত করেনি। তারা এই যুদ্ধে শুধু টিকেই থাকেনি, বরং আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে।

শুরু থেকেই তেহরানের মূল লক্ষ্য সামরিক লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে পুরোপুরি পরাজিত করা ছিল না। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, যেকোনো মূল্যে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থা ও দেশের নেতৃত্বকে অক্ষত রাখা। নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থান যেন পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে তা নিশ্চিত করা।

এখন দুই দেশের মাঝে হওয়া চুক্তির মাধ্যমে ইরান সেই লক্ষ্য অর্জন করেছে বলে দাবি করার সুযোগ পেয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আলাদাভাবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।

এই চুক্তিটি মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানি জাহাজের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

চুক্তিতে ইরানের তাৎক্ষণিক দায়বদ্ধতাগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা তুলনামূলকভাবে সীমিত। তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সাহায্য করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান কেবল যুদ্ধই থামায়নি, বরং লাভবান হবে রাজনৈতিকভাবে। তেহরান এখন বলতে পারছে, শত্রুর সামনে তারা মাথা নত করেনি।

তবে চুক্তিতে ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ব্যাপক। চুক্তি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া শুরু করবে। ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে। আটকে থাকা ইরানি অর্থ ও সম্পদ ছেড়ে দেবে। সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের লক্ষ্যে কাজ করবে। আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করবে।

চুক্তিতে এসব বড় বড় সুবিধার কারণেই ইরানের সমালোচকেরা এখন পর্যন্ত বেশ শান্ত রয়েছেন। এই চুক্তিটি দেশটির সরকারকে জনগণের সামনে বড় এক জয় উদযাপনের সুযোগ করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফায়দা কেমন

ইরানের সঙ্গে এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ‘বিজয়’ বা ‘বড় জয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার যে লক্ষ্য ছিল, তা পূরণ করতে সক্ষম হবে।

তবে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর চেয়েও বড় বিজয় হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে যাওয়া। যার ফলে স্থবির হয়ে পড়া বিশ্ব অর্থনীতি আবার সচল হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়া এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকার কারণে মার্কিন জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিচ্ছিল। বিভিন্ন জনমত জরিপে উঠে এসেছিল, আমেরিকার সাধারণ মানুষ গ্যাসের আকাশচুম্বী দাম এবং এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলেন।

মূলত দেশটির ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতি নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়েই ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটাররা ট্রাম্পকে আবার প্রেসিডেন্ট বানিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের শুরু করা এই যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের খরচ অনেক বেড়ে যায়। মানুষের পকেটে টান পড়ায় বিষয়টি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে বেশ ক্ষতিকর হয়ে উঠছিল।

ইরানের সঙ্গে এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ‘বিজয়’ বা ‘বড় জয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

পরিস্থিতি বিবেচনায় এই চুক্তিটি ট্রাম্পকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক সহযোগীদের আশা, এর মাধ্যমে ট্রাম্প নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে প্রমাণ করতে পারবেন, যিনি সংঘাতের দ্রুত অবসান ঘটিয়েছেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মতোই আমেরিকাকে যুদ্ধে জড়ানো থেকে রক্ষা করেছেন।

তবে নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরের কয়েকজনই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইরানকে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। এই বিরোধিতার মূলে রয়েছে ইরানের জন্য রাখা ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল।

সমালোচনার জবাবে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভুয়া। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এতে কেবল রয়েছে সাফল্য, তেলের কম দাম এবং বিজয়।’

টেক্সাসের সিনেটর ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী টেড ক্রুজ মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য হিলকে বলেছেন, ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, যেসব উগ্রবাদীরা আমাদের হত্যা করতে চায়, তাদের হাতে কোটি কোটি ডলার তুলে দেওয়া কখনোই ভালো বুদ্ধি নয়। আমার মনে হয়, প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত ভুল কিছু পরামর্শ পাচ্ছেন।

এদিকে, আলোচিত এই সমঝোতা স্মারকে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধকালীন বেশ কয়েকটি মূল লক্ষ্যকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে স্বীকার করেছে হোয়াইট হাউজ। যেমন যুদ্ধের শুরুর দিকে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির শিল্পকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে। কিন্তু এই সমঝোতা স্মারকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কোনো কথাই উল্লেখ নেই।

একইভাবে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তেহরানের সম্পর্কের বিষয়েও চুক্তিতে কোনো কথা নেই। অথচ গত মার্চেই ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ইরান যেন দেশের বাইরে কোনো বাহিনীকে অর্থ বা অস্ত্র দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করবে যুক্তরাষ্ট্র।

প্রশাসন এখন সেই লক্ষ্য থেকেও পিছু হটেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কেবল আশা করে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলিদের ওপর হামলা চালানো থেকে বিরত থাকবে।

সূত্র : বিবিসি