Image description

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের স্থায়ী আলোচনার পথ সহজ করতে সম্প্রতি সই করা সমঝোতা স্মারককে ২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার করা চুক্তির চেয়ে অনেক উন্নত বলে দাবি করেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।  তবে ট্রাম্পের সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প ইরনাকে ওবামার চেয়েও বেশি সুবিধা দিয়েছেন।

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনের খবরে বলা হয়, দুটি চুক্তির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক সই করেছেন, তা কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়। এটি কেবল দেড় পৃষ্ঠার ১৪ দফা কাঠামো, যা কয়েক সপ্তাহ ধরে অনিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে তৈরি হয়েছে।

এই কাঠামো অনুযায়ী যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে ৬০ দিনের একটি আলোচনার সময় শুরু হয়েছে। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎসহ বিভিন্ন জটিল বিষয় নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা চলবে।

অন্যদিকে ওবামার করা চুক্তি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত দলিল, যার নাম ছিল ‘যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা’ (জয়েন্ট কম্প্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন-জেসিপিওএ), যা ১৬০ পৃষ্ঠারও বেশি বিস্তৃত ছিল। এটি মূলত ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল এবং এতে কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল। ট্রাম্প পরবর্তীতে এই চুক্তিকে সমালোচনা করে ২০১৮ সালে তা বাতিল করেন।

ওবামার চুক্তি ছিল বহুপক্ষীয়, যেখানে চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্ত ছিল এবং আলোচনা চলেছিল প্রায় দুই বছর ধরে। অন্যদিকে ট্রাম্পের উদ্যোগটি সম্পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক, শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমিত।

পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে উভয় চুক্তিতেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত করতেই এবারের যুদ্ধ শুরু হয়েছে, ইরান এর আগে কখনো পারমাণবিক অস্ত্রের পথে যায়নি।

অবশ্য সমালোচকদের মতে এটি সম্পূর্ণ ভুল দাবি। ওবামার সময়কার চুক্তিতেই ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর কঠোর সীমা আরোপ করা হয়েছিল, যাতে তারা দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, ট্রাম্প সেই চুক্তি বাতিল করার আগ পর্যন্ত ইরান তাদের নিয়ম মেনে চলছিল।

ট্রাম্পের বর্তমান সমঝোতা কাঠামোতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই। শুধু ৬০ দিনের আলোচনার সময় সাধারণভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার কথা বলা হয়েছে। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ইরানের প্রায় পারমাণবিক মানের ইউরেনিয়াম মজুদের বিষয়ে সমাধান হতে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরবর্তী আলোচনার ওপর নির্ভর করবে।

নিষেধাজ্ঞা ও জব্দকৃত সম্পদের বিষয়েও দুটি চুক্তির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। উভয় চুক্তিতেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয় রয়েছে, তবে পদ্ধতি আলাদা।

ওবামার চুক্তিতে ইরান প্রথমে পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা সম্পন্ন করার পর ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল, এবং ইরানের অগ্রগতি যাচাই করে তবেই পরবর্তী ছাড় দেওয়া হতো।

ট্রাম্পের কাঠামোতে শুরুতেই কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কথা রয়েছে, যার মধ্যে ইরানকে তেল রপ্তানির জন্য তাৎক্ষণিক মার্কিন অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি পরে আরও বড় আর্থিক প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এতে কয়েক বিলিয়ন ডলার জব্দকৃত অর্থ ছাড় দেওয়ার পথও খোলা হয়েছে। আরও একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা মিলে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন তহবিল গঠন করতে পারে। অবশ্য ঘোষিত তহবিলের শর্ত ও সময়সূচি স্পষ্ট নয়। ওবামার চুক্তিতে এমন কোনো অর্থনৈতিক তহবিলের শর্ত নেই।

রিপাবলিকান শিবিরের প্রতিনিধিত্ব করা ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ডেমোক্র্যাট নেতা ওবামার তীব্র সমালোচনা করে আসছেন। বিশেষ করে ১৯৮১ সাল থেকে জব্দ থাকা অস্ত্র বিক্রির ১৭০ কোটি ডলার ইরানকে ফেরত দেওয়ার কারণে তিনি প্রকাশ্যে ওবামাবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন।

তবে সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের বর্তমান কাঠামোতে ইরান তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।

হরমুজ প্রণালির বিষয়েও দুটি চুক্তির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ওবামার চুক্তি কেবল পারমাণবিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ ছিল এবং আঞ্চলিক বিষয়গুলো বাদ রাখা হয়েছিল, কারণ তখন ধারণা ছিল এসব বিষয় যুক্ত করলে ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করা কঠিন হবে।

কিন্তু ট্রাম্পের সমঝোতা কাঠামো যুদ্ধ অবসানের প্রাথমিক ভিত্তি হওয়ায় এতে কার্যত অচল হয়ে পড়া হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইরানের দাবি, এই গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথটির ব্যবস্থাপনায় তারা মূল ভূমিকা রাখতে চায়, যা ভবিষ্যৎ আলোচনায় বড় বিরোধের কারণ হতে পারে।