তিন মাসের বেশি ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের পর ইরান প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি শক্ত অবস্থানে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে। সামরিক দিক থেকে নয়, বরং কৌশলগত ও রাজনৈতিক দিক থেকে এখন তেহরানই কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে। তখন ধারণা করা হচ্ছিল যে, তেহরান খুব দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়বে। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ও শক্তিশালী দুই সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে ইরানকে লড়াই করতে হচ্ছিল।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের ওপর ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা করা হয়। এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও নিহত হন। দেশটির বিমান ও নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। শত শত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়। দেশটির পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কারখানায়ও ব্যাপকভাবে বোমাবর্ষণ করা হয়। তবে ইরান দ্রুত নতুন নেতৃত্ব গঠন করে এবং তাদের অবশিষ্ট সামরিক শক্তি ব্যবহার করে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। তখনও অনেকের ধারণা ছিল যে, ইরানের সরকার হয়তো টিকে থাকতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। বুধবার প্রকাশিত এশিয়া টাইমসের এক নিবন্ধে লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধবিদ্যা বিভাগের ভিজিটিং রিচার্স ফেলো জিম জ্যামসন ও একই কলেজের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিভাগের অধ্যাপক ম্যাথিউ মর্গান এসব অভিমত দিয়েছেন।
দুর্বল পক্ষের কৌশল: মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল সোবেলম্যানের মতে, যখন কোনো দুর্বল দেশ শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তখন তাকে এমনভাবে পরিস্থিতি তৈরি করতে হয়, যাতে প্রতিপক্ষও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। অর্থাৎ শত্রুর দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে হয় এবং নিজের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
এই ধরনের চিন্তাভাবনা বহুদিন ধরেই ইরানের সামরিক কৌশলের অংশ। তারা সবসময় চেষ্টা করেছে শত্রুর দুর্বল জায়গায় আঘাত করতে এবং নিজেদের দুর্বলতা কমিয়ে রাখতে।
যদিও যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের প্রতিরোধ কৌশল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে হামলা থেকে বিরত রাখতে পারেনি, যুদ্ধ চলাকালে তারা পরিস্থিতি বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে। ইরান শত্রুদের ওপর এমন কিছু চাপ সৃষ্টি করেছে, যার ফলে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতির কথা ভাবতে হয়েছে।
অসম যুদ্ধের কৌশল: এপ্রিলের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারছে না। তারা সরকার পরিবর্তনের পরিবেশও তৈরি করতে পারেনি। একই সঙ্গে ইরানের সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনও ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি।
ইরান প্রচণ্ড ক্ষয়ক্ষতির পরও ইসরাইল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যায়। এ ছাড়া তারা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর জ্বালানি ও অবকাঠামোতেও আঘাত হানে।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো নিজেদের নিরাপদ বলে দাবি করতে পারছিল না। বরং মার্কিন সমর্থন পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব: ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত পদক্ষেপ ছিল হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। এই সমুদ্রপথ বিশ্বের তেল, গ্যাস ও সার পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট।
এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। তেলের দাম বেড়ে যায় এবং খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়ে। ফলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল নয়, বিশ্বের অনেক দেশই এর অর্থনৈতিক প্রভাব অনুভব করতে শুরু করে।
শত্রুর দুর্বলতা কাজে লাগানো: ইরান আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে নিজেদের প্রতিরক্ষা বজায় রাখতে বিপুল পরিমাণ ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এসব অস্ত্র দ্রুত তৈরি করা যায় না এবং ফের মজুত করতেও অনেক সময় লাগে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে এটি তাদের জন্যও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ইরান এই দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে।
একই সঙ্গে তেহরান আরও হুমকি দিতে শুরু করে। তারা জানায়, প্রয়োজনে ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা এবং অবকাঠামোর ওপর আরও বড় আকারের হামলা চালানো হবে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সাবমেরিন কেবলগুলোতেও আঘাত হানার হুমকি দেওয়া হয়।
ইয়েমেনের হুতিদের ভূমিকা: ইরান আরও জানায় যে, তাদের মিত্র ইয়েমেনি হুতি বাহিনীকে ব্যবহার করে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা হতে পারে। যদি তা ঘটত, তাহলে বিশ্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমুদ্রপথও ঝুঁকির মধ্যে পড়ত।
যুদ্ধের ফলাফল: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সামরিক শক্তি অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ সামরিকভাবে তারা কিছু লক্ষ্য অর্জন করেছে।
কিন্তু তাদের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য—ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা বা সরকার পরিবর্তন ঘটানো—যা সফল হয়নি। অন্যদিকে ইরান নিজেও বড় ক্ষতির শিকার হলেও প্রতিপক্ষের ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছে। ফলে কৌশলগতভাবে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বর্তমানে ইরান এখনও নতুন হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবুও তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং পুরো অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতাও বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে ইরান তাদের প্রতিরোধ জোট—বিশেষ করে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতিদের—পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তেহরান দাবি করছে, এই জোটের কোনো সদস্যের ওপর হামলা হলে সবাই মিলে সমন্বিত প্রতিক্রিয়া জানাবে। ভবিষ্যতে ইরান এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে একদিকে সামরিক চাপ বজায় রাখতে এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় সুবিধা নিতে চাইবে। পাশাপাশি তারা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পুনর্গঠন ও আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
শীর্ষনিউজ