মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ছক কষছিলেন, তখন তাদের চোখে ছিল এক নতুন মধ্যপ্রাচ্যের ছবি। তাদের বিশ্বাস ছিল, ইরানের পতন ঘটাতে পারলেই এই অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে যাবে।
যুদ্ধে ইরান পরাজিত হওয়া তো দূরের কথা, বরং অঞ্চলটি এখন এক দীর্ঘস্থায়ী, ক্ষয়িষ্ণু সংকটের আবর্তে আটকা পড়েছে—যেখানে যেকোনো মুহূর্তেই পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠার ঝুঁকি রয়েছে।
তেহরানের শাসন ব্যবস্থাকে যতটা দুর্বল ভেবেছিলেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু বাস্তবতা তা নয়। পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ এখন আর তাদের হাতে নেই।
এই নতুন বাস্তবতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ— সব শেষ ইরানের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা। এটি কেবল একটি সামরিক ক্ষতি নয়, এটি একটি জোরালো সতর্কবার্তা।
তেহরানের কাছে 'বিজয়' মানে কেবল যুদ্ধের ময়দানে টিকে থাকা নয়, বরং তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রদর্শনী করা। এর বড় দৃষ্টান্ত হলো হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ এখন তাদের কবজায়, যা বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন।
এখন পরিস্থিতির চাপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার জেনারেলরা এক জটিল সমীকরণে আটকে আছেন। একদিকে হেলিকপ্টার হারানোর জেরে সামরিক প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে অকার্যকর কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোকে জিইয়ে রাখার চাপ। হেলিকপ্টারের ক্রুরা বেঁচে যাওয়ায় আপাতদৃষ্টিতে একটি বড় ধরনের যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের জন্য চ্যালেঞ্জটা অনেক বড়। আমেরিকায় এই যুদ্ধ ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয়তার হার হারাচ্ছে, ফলে তিনি এমন একটি উপায় খুঁজছেন যাকে 'বিজয়' বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। সেই লক্ষ্যে তিনি ইরানকে দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে চান, যার শুরুটা হবে ইউরেনিয়াম মজুদ ও পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো দিয়ে।
যুদ্ধ শুরুর দিনগুলো মনে পড়ে? ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দামামা বাজিয়েছিলেন, তখন ট্রাম্প আর নেতানিয়াহুর কণ্ঠে ছিল নিশ্চিত বিজয়ের দম্ভ। ট্রাম্প তার মার-এ-লাগো রিসোর্ট থেকে ইরানবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ‘সাহায্য আসছে’। অন্যদিকে, তেল আবিবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছাদে দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহু দেখেছিলেন তার ৪০ বছরের লালিত স্বপ্ন—ইরানের বিদ্যমান শাসনকে ধ্বংস করা।
ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন ১৯৭৯ সালের পর থেকে টিকে থাকা ইরানের শাসন ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। কিন্তু তাদের 'টেক্সটবুক' কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। তারা ইরানের শাসন ব্যবস্থার স্থায়িত্ব, ধূর্ততা এবং রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতাকে চরমভাবে অবমূল্যায়ন করেছিলেন। কেবল সর্বোচ্চ নেতা বা তার ঘনিষ্ঠদের সরিয়ে দিলেই শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—এমন ধারণা ছিল বাস্তবতাবিবর্জিত। এর মাশুল গুনতে হচ্ছে তাদের মিত্রদেরও।
উপসাগরীয় তেল সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলো, যারা এই অঞ্চলে ব্যবসার মরূদ্যান গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল, এখন যুদ্ধের তোপে তাদের সেই স্বপ্ন মরীচিকায় পরিণত হতে দেখছে।
ইরানের নতুন নেতৃত্ব তাদের পূর্বসূরিদের চেয়েও বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। তারা লেবাননের যুদ্ধের সঙ্গে উপসাগরীয় যুদ্ধের কৌশলগত সংযোগ স্থাপন করে আমেরিকাকে কোণঠাসা করার পরিকল্পনা করেছে।
ট্রাম্প পরোক্ষভাবে এই সংযোগটি স্বীকার করে বৈরুতে হামলার পরিকল্পনা সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যদিও নেতানিয়াহু সোমবার এই সংযোগকে "অসহনীয় ও অগ্রহণযোগ্য" বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতে পরিস্থিতির বিশেষ পরিবর্তন ঘটেনি।
ট্রাম্পের কাছে এখন অগ্রাধিকার হলো কোনোমতে সম্মানজনকভাবে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা। অন্যদিকে নেতানিয়াহু যুদ্ধ চালিয়ে যেতে মরিয়া। এরই মধ্যে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা অব্যাহত রয়েছে।
সব মিলিয়ে মার্চ মাস থেকে বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালী এখন এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। কোনো অলৌকিক কূটনৈতিক সাফল্য ছাড়া এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি খোলার কোনো পথ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু আজ যুদ্ধের সেই চিরন্তন অভিশাপের মুখোমুখি—যেখানে যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, পরিষ্কার বিজয়ের মাধ্যমে তা শেষ করা ততটাই দুঃসাধ্য।
সূত্র: বিবিসি