Image description

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুধু স্থলভাগেই নয়, গভীর সংকটে ফেলেছে বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যকেও। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ জাহাজসহ কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন ২০ হাজার নাবিক।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটে রয়েছে বাংলাদেশি জাহাজ বাংলার জয়যাত্রা। ৩৭ হাজার টন সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার কথা থাকলেও বারবার ব্যর্থ হয়েছে বের হওয়ার চেষ্টা। জাহাজটি তিন মাস ধরে অপেক্ষা করছে মুক্ত জলপথের।

বাংলার জয়যাত্রার ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে আমরা যেন একটি পুকুরে আটকা পড়ে আছি। এখান থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ হরমুজ প্রণালি।’

দক্ষিণ আফ্রিকাগামী প্রায় ৩৭ হাজার টন সার বহন করা জাহাজটির ক্যাপ্টেন শফিকুল যুদ্ধ শুরুর পর দুইবার প্রণালি পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দুইবারই ফিরে আসতে হয় তাকে।

৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর তিনি জানতে পারেন, একটি জাহাজ ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অনুমতি পেয়েছে। এরপর আরও চারটি জাহাজের সঙ্গে যাত্রা শুরু করেন তিনিও। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই ফিরে যেতে সতর্ক করা হয় তাদের।

৯ দিন পর ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে আবারও ফিরে আসতে বাধ্য হয় বাংলার জয়যাত্রা।

নিরাপত্তার কারণে অনেক জাহাজ এখন বিভিন্ন বন্দরে বা উপকূলের বাইরে নোঙর করে আছে। তবে দিন দিন খাদ্যের সঙ্গে সংকট বাড়ছে বিশুদ্ধ পানিরও। দুবাই, আবুধাবি ও কুয়েতের কাছের সাপ্লাই সার্ভিস চালু থাকলেও সরবরাহ অনিশ্চিত। সব জিনিসের মধ্যে পানির দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বলে জানান বাংলার জয়যাত্রার প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান।

তিনি বলেছেন, ‘দুই দিন আগে জাহাজের জন্য প্রায় ১৮০ টন পানি কিনেছি। আগে যেখানে দাম পড়ত ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ডলার। এখন পড়েছে ১১ হাজার ডলার।

রাশেদুল হাসানদের মতো প্রণালিতে আটকা পড়েছেন পাকিস্তানি নাবিক হাসান খান। তিনি জানান, সমুদ্র কখনো কখনো এতটাই শান্ত থাকে যে তিনি ভুলেই যান তিন মাস ধরে একটি যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে আটকা পড়ে আছেন। নিজের প্রকৃত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই নাবিক বলেছেন, ‘বাইরে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরের মানুষগুলোর মন মোটেও শান্ত নেই।’

পারস্য উপসাগরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের কারণে ক্যাপ্টেন খানসহ হরমুজ প্রণালির ভেতরে বা আশপাশে আটকা পড়ে আছেন প্রায় ২০ হাজার নাবিক।

বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথ দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। কিন্তু এখন আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র উড়ছে, সমুদ্রের নিচে পাতা হয়েছে মাইন। ফলে কার্যত থমকে গেছে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ।

এ অবস্থায়ও স্বাভাবিক কর্মসূচি বজায় রাখার চেষ্টা করছেন ক্যাপ্টেন খানের জাহাজের নাবিকেরা। তবে সীমিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেউ তীরে নামতে চান না। একসময়কার প্রাণবন্ত আড্ডার জায়গা নিয়েছে উৎকণ্ঠা ও নীরবতা। মোবাইল ফোনের শব্দেও চমকে উঠছেন অনেকে।

ক্যাপ্টেন খান বলেছেন, ‘চাপটা সব সময় মাথার মধ্যে কাজ করে। শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সবাই।’

বাংলার জয়যাত্রা জাহাজের ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম (সামনের সারিতে ডান দিক থেকে দ্বিতীয়) এবং প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান (ক্যাপ্টেনের বাম পাশে বসা) নাবিকদের মনোবল চাঙা রাখতে একটি ভিডিও বার্তা ধারণ করছেনআন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) জানিয়েছে, বর্তমানে হরমুজ প্রণালির ভেতরে আটকা রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ জাহাজ। যুদ্ধ শুরুর কয়েকদিন পর প্রণালিটি বন্ধ করে দেয় ইরান। বিশেষ অনুমতি ছাড়া প্রণালি পার হতে দিচ্ছে না কোনো জাহাজকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কোরীয় নাবিকের অভিযোগ, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করছে কিছু খাবার ও পানির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। গ্রীষ্মকাল ঘনিয়ে আসায় আটকে পড়া জাহাজে আরও বেশি পানির দরকার। মে মাসেই তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে, যা ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে।

ক্যাপ্টেন খান জানান, এখনো খাবার ও পানি রয়েছে তাদের কাছে। তবে আগের তুলনায় অনেক সীমিত। মাংস পাওয়া গেলেও কঠিন হয়ে পড়েছে সবজি ও ডাল সংগ্রহ করা।

নিজেকে এখনও ভাগ্যবান মনে করেন ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে তার জাহাজ ছিল দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরের মাত্র ২০০ মিটার দূরে। তখন ইরানি হামলা চালানো হয় ওই এলাকায়।

তার ভাষ্য, ‘এরপর থেকে অসংখ্য হামলার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি ও তার ৩০ জন নাবিক। কখনো ক্ষেপণাস্ত্র একটি জাহাজের ওপর দিয়ে উড়ে গেছে, কখনো পাশের জাহাজের কাছে ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখেছেন।’
রাশেদুল হাসান বলেছেন, ‘রাতভর হামলা চললে আমাদের কারও ঘুম হতো না। আমরা নিজের চোখে ভয়াবহতা দেখেছি।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরসহ উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে পাল্টা হামলা চালায়আইএমওর তথ্যমতে, এ পর্যন্ত যাচাই করা ৩৯টি ঘটনায় অন্তত ১১ জন নাবিক নিহত হয়েছেন এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন।

যুদ্ধবিরতির পর উত্তেজনা কিছুটা কমলেও প্রণালিতে সামরিক তৎপরতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত ড্রোন, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন দেখতে পাচ্ছেন অনেক নাবিক।

একটি তেলবাহী জাহাজে কর্মরত পাকিস্তানি রাঁধুনি সাজিদ মাসুদ বলেছেন, ‘যুদ্ধজাহাজগুলো রাতে উজ্জ্বল আলো ব্যবহার করে। লাউডস্পিকারে ঘোষণা দেওয়া হয়। আমাদের ক্যাপ্টেনের ধারণা, কেউ যেন প্রণালি পার হতে না পারে। সেজন্যই এসব করা হচ্ছে।’

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকায় শেষ হয়ে যাচ্ছে নাবিকদের চুক্তির মেয়াদ। যুদ্ধ শেষ হলেও পর্যাপ্ত জনবল পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাকিস্তানি নাবিক কামিল বলেছেন, ‘এই সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, নাবিকের পেশা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ভবিষ্যতে অনেকেই হয়তো এই পেশা নিয়ে নতুন করে ভাববেন।’

সমুদ্রে কাজ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে সাজিদ মাসুদেরও। তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র এক মাস বাকি। তবে সবকিছুর আগে দেশে ফিরতে চান তিনি। মেয়েদের জন্য বার্বি পুতুল এবং ছেলের জন্য একটি খেলনা বিমান নিয়ে পরিবারের কাছে ফেরার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

তিনি বলেছেন, ‘ভেবেছিলাম দ্রুত বাড়ি ফিরব। কিন্তু এখনো আটকে আছি। প্রতিদিন পরিবার জানতে চায় কবে ফিরব। কিন্তু আমার কাছে কোনো উত্তর নেই।’

 

সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে কোনো না কোনোভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে প্রায় ৭৫০টি জাহাজ।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএনএর বিশেষজ্ঞ ড. জনাথন শ্রোডেনের মতে, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের কিছু জাহাজ সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনুমতি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিটি জাহাজের জন্য কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ফি পরিশোধ করা হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, প্রথমদিকে বাংলাদেশ ইরানের নির্ধারিত ফি দিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিলে সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। তার ভাষ্য, ‘আমরা এখন দ্বৈত সংকটে রয়েছি।’

সূত্র: বিবিসি