ইসরায়েলের পরবর্তী সামরিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারে তুরস্ক ও মিসর—এমনটাই দাবি করেছেন ইসরায়েলের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে দণ্ডিত সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষক জনাথন পোলার্ড। একই সঙ্গে ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আংকারাকে ‘নতুন ইরান’ এবং ভবিষ্যৎ শত্রু হিসেবে দেখানোর যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, পোলার্ডের বক্তব্যে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। খবর মিডল ইস্ট মনিটর
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের একটি পডকাস্টে জনাথন পোলার্ড বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পর ইসরায়েলকে আরো বড় আঞ্চলিক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ইরানিদের সঙ্গে আমাদের যতটা সহজ সময় কেটেছে, তুর্কিদের সঙ্গে ততটা সহজ হবে না। আমাদের পরবর্তী যুদ্ধ সম্ভবত হবে তুরস্ক ও মিসরের বিরুদ্ধে। একটি বড় ঝড় আসছে।
তুরস্ককে ‘নতুন ইরান’ বানানোর চেষ্টা
পোলার্ড সিরিয়ায় তুরস্ক-সমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ইসরায়েলি বাহিনী দ্বারা দখলকৃত দক্ষিণাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধেও ইসরায়েলকে সতর্ক করেছেন। তিনি যুক্তি দেন, এই ধরনের পদক্ষেপ তুর্কিদের ইসরায়েলি সীমান্তে নিয়ে আসবে। সিরিয়ায় তুরস্কের ভূমিকা এবং এর ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে তার এই মন্তব্য এসেছে।
এই মন্তব্যগুলো তুরস্ককে একটি বড় সামরিক হুমকি হিসেবে নতুন করে তুলে ধরার বৃহত্তর ইসরায়েলি প্রচেষ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তুরস্ককে ‘নতুন ইরান’ হিসেবে তুলে ধরা হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলি সরকার-নিযুক্ত একটি কমিটি সিরিয়ায় তুরস্কের সঙ্গে সম্ভাব্য সরাসরি সংঘাতের বিষয়ে সতর্ক করে এবং আংকারাকে ইসরায়েলি স্বার্থের জন্য একটি নতুন আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে বর্ণনা করে।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎস এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল।
ইসরায়েলের ঝুঁকিতে মিসর ও ‘সুন্নি বলয়’
ইসরায়েলের হুমকি মূল্যায়নে মিসরের নামও এখন আরো ঘন ঘন উঠে আসছে। ফেব্রুয়ারিতে একটি ইসরায়েলি বিশ্লেষণে উদীয়মান তুর্কি-মিসরীয় জোটের বিষয়ে সতর্ক করা হয়। ওই সতর্কতায় ইসরায়েলকে ঘিরে একটি ‘সুন্নি বলয়’ তৈরি হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়। এটি তেল আবিবের এমন এক উদ্বেগের প্রতিফলন, যা এমন দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় নিয়ে দেখা দিয়েছে, যারা ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখলেও গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার তীব্র সমালোচনা করেছে।
পোলার্ড, মার্কিন নৌবাহিনীর একজন প্রাক্তন গোয়েন্দা বিশ্লেষক, ১৯৮৭ সালে ইসরায়েলের কাছে গোপনীয় মার্কিন তথ্য পাচারের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। এটি ছিল দুই মিত্র দেশের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর গুপ্তচরবৃত্তির মামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ৩০ বছর কারাভোগের পর ২০১৫ সালে তিনি প্যারোলে মুক্তি পান।
পরবর্তী ইসরায়েলি সরকারগুলো পোলার্ডের মুক্তির জন্য প্রচারণা চালিয়েছিল এবং ২০২০ সালে প্যারোলের শর্ত শেষ হওয়ার পর তিনি ইসরায়েলে পৌঁছালে নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে তাকে স্বাগত জানান। নেতানিয়াহু বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে পোলার্ড ও তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন, তাকে একটি ইসরায়েলি পরিচয়পত্র প্রদান করেন এবং বলেন, ‘স্বাগতম, ঘরে ফিরেছেন। এখন আপনি ইসরায়েল রাষ্ট্রের একজন নাগরিক।’
ইসরায়েলে স্থায়ী হওয়ার পর থেকে পোলার্ড ইসরায়েলি উগ্র ডানপন্থিদের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছেন। তাকে জাতীয় বীর হিসেবে বরণ করা হয়েছে এবং তিনি ইসরায়েলি ডানপন্থিদের একজন সোচ্চার সমর্থক হয়ে উঠেছেন, যার মধ্যে গাজা দখল ও সেখানে বসতি স্থাপনের আহ্বানও রয়েছে।
পোলার্ড ইহুদিদের ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করার জন্যও উসকানি দিয়েছেন। মুক্তি পাওয়ার পর, এই সাজাপ্রাপ্ত গুপ্তচর আরও বেশি আমেরিকানকে তাদের দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার আহ্বান জানান। এর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ইসরায়েলের বাইরের ইহুদিদের উচিত তাদের রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেয়া।
কে এই জনাথন পোলার্ড?
অপরাধ : মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক এই গোয়েন্দা বিশ্লেষককে ১৯৮৭ সালে ইসরায়েলের কাছে আমেরিকার অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য পাচারের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
মুক্তি ও নাগরিকত্ব : ৩০ বছর সাজা খাটার পর ২০১৫ সালে তিনি প্যারোলে মুক্তি পান। ২০২০ সালে তিনি ইসরায়েলে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বয়ং বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে তাকে স্বাগত জানান এবং তার হাতে ইসরায়েলি নাগরিকত্বের পরিচয়পত্র তুলে দেন।
বর্তমান অবস্থান : ইসরায়েলে ফেরার পর থেকেই পোলার্ড দেশটির অতি-ডানপন্থীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন এবং গাজা দখল ও সেখানে নতুন করে ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নেন। এমনকি বিশ্বের অন্যান্য দেশে বসবাসরত ইহুদিদের প্রয়োজনে ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করার আহ্বান জানিয়ে ব্যাপক সমালোচিত হন পোলার্ড।