Image description

ইতিহাসের দীর্ঘ সময় ধরে হজযাত্রা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন সফরগুলোর একটি। মাসের পর মাস উটের কাফেলায় মরুভূমি পাড়ি দেওয়াউত্তাল সমুদ্রযাত্রাখাদ্য ও পানির সংকটমহামারিডাকাতিভাষাগত সমস্যা এবং নিরাপত্তাহীনতা ছিল হজের অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। অনেক হাজি জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ব্যয় করে হজে যেতেনকিন্তু আর ফিরে আসতে পারতেন না।

 

আজকের পৃথিবীতে সেই বাস্তবতা আমূল বদলে গিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি হজযাত্রাকে শুধু সহজই করেনিবরং এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিনির্ভর মানবসমাবেশগুলোর একটিতে রূপান্তর করেছে। বর্তমানে হজ ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাস্মার্ট ডিভাইসরিয়েল-টাইম ডাটা বিশ্লেষণডিজিটাল প্ল্যাটফর্মস্বাস্থ্য প্রযুক্তিস্মার্ট পরিবহনরোবটিক সেবা ও অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রযুক্তির এ সমন্বয় লাখো মানুষের সমাগমকে নিরাপদনিয়ন্ত্রিত ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে সাহায্য করছে।

 

একসময় হজ নিবন্ধনভিসা সংগ্রহআবাসন নির্ধারণকাফেলার তথ্য জানা কিংবা যাতায়াতের পরিকল্পনা করা ছিল অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ। এখন সেই প্রক্রিয়া অনেকটাই ডিজিটাল হয়ে গেছে। সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় 'নুসুক' (Nusuk) নামের একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করেছেযা বর্তমানে হজ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় প্রযুক্তিগত ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একজন হাজি অনলাইনে নিবন্ধনই-ভিসাহোটেল বুকিংপরিবহন সেবাসময়সূচিমানচিত্রদোয়া ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পেয়ে থাকেন। রিয়াজুল জান্নাহ ভিজিটের সময় নির্ধারণ থেকে শুরু করে হজের পাঁচ দিনের প্রতিটি ধাপ এখন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে দেখা যায়।

 

প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি হলো ভিড় নিয়ন্ত্রণ। হজের সময় একই স্থানে কয়েক মিলিয়ন মানুষ অবস্থান করেন। বিশেষত তাওয়াফসাঈমিনাআরাফাত ও জামারাতে মানুষের চাপ অত্যন্ত বেশি থাকে। অতীতে এ ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বহু দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এখন সৌদি কর্তৃপক্ষ এআই-ভিত্তিক স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহার করছে। হারাম এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপন করা হয়েছে হাজারো স্মার্ট ক্যামেরা ও সেন্সরযা মানুষের চলাচল বিশ্লেষণ করে থাকে। কোথাও অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হলে সিস্টেম তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা দেয় এবং প্রশাসন বিকল্প পথ বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এআই প্রযুক্তি মানুষের চলাচলের ধরণ বিশ্লেষণ করে আগে থেকেই অনুমান করতে পারে কোন এলাকায় চাপ বাড়তে পারে।

 

সম্প্রতি সৌদি আরবের উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ওয়াদি মক্কার অধীন আল-আমাদ’ স্টার্টআপ পবিত্র স্থানসমূহের পথ’ নামে একটি এআই-চালিত স্মার্ট মোবিলিটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। এই প্রযুক্তি রিয়েল-টাইম ডাটা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হাজিদের চলাচল আরও দ্রুতনিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করার কাজ করছে। কোথায় যানজট তৈরি হতে পারেকোথায় অতিরিক্ত ভিড় হচ্ছে কিংবা কোন রুট নিরাপদ এসব তথ্য আগে থেকেই বিশ্লেষণ করা যায়। ফলে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে যায়।

অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) প্রযুক্তি হজ প্রশিক্ষণেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একজন হাজি এখন বাস্তবে যাওয়ার আগেই ভার্চুয়ালি কাবামিনাআরাফাত ও জামারাতের পরিবেশ দেখে নিতে পারেন। এর ফলে নতুন হাজিদের মানসিক প্রস্তুতি সহজ হয় এবং বাস্তব পরিবেশে বিভ্রান্তি কমে। শুধু হাজিরাই ননহজসেবায় নিয়োজিত কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরাও এ প্রযুক্তির মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। অতিরিক্ত গরমহঠাৎ অসুস্থতা বা ভিড় নিয়ন্ত্রণের মতো পরিস্থিতি ভার্চুয়াল সিমুলেশনের মাধ্যমে অনুশীলন করা হচ্ছে।

 

ব্যক্তিগত পর্যায়ে একজন হাজির জীবনেও প্রযুক্তি বড় পরিবর্তন এনেছে। আগে একজন হাজিকে হজের মাসআলাপথঘাটভাষাগত সমস্যা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মতো নানা সমস্যায় পড়তে হতো। এখন ইন্টারনেট ও এআই সেই সমস্যাগুলোর বড় অংশ সমাধান করছে। একজন হাজি ঘরে বসেই অনলাইন ক্লাসভিডিও লেকচার ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে হজের প্রতিটি ধাপ শিখতে পারেন। কাবা তাওয়াফ কীভাবে করতে হবেজামারাতে কখন যেতে হবেকোন দোয়া পড়তে হবে সবকিছুর ভিডিওভিত্তিক নির্দেশনা এখন সহজলভ্য।

 

এআই-ভিত্তিক অনুবাদ প্রযুক্তি ভাষাগত সমস্যাও কমিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা হজে অংশ নেন। একজন বাংলা ভাষাভাষী হাজি আরবি না জানলেও এখন স্মার্টফোনের অনুবাদ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজে কথা বলতে পারেন। হাসপাতালদোকানপরিবহন কিংবা প্রশাসনিক সেবায় এটি বিশেষ সহায়ক।

জিপিএস ও গুগল ম্যাপ প্রযুক্তি হজযাত্রায় অনেক বড় সুবিধা এনে দিয়েছে। মক্কামিনা ও মদিনার বিশাল জনসমুদ্রে পথ হারানো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এখন হাজিরা অফলাইন ম্যাপ ডাউনলোড করে নিজেদের হোটেলকাফেলা বা নির্দিষ্ট গেট সহজে খুঁজে পেতে পারেন। লাইভ লোকেশন শেয়ার করে পরিবারের সদস্য বা কাফেলার সঙ্গে সংযুক্ত থাকাও সহজ হয়েছে।

তাওয়াক্কালনা (Tawakkalna) অ্যাপও বর্তমানে হজ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এতে হাজিদের ভিসাপাসপোর্টস্বাস্থ্যবিমা ও নিরাপত্তা তথ্য সংরক্ষিত থাকে। বিভিন্ন নিরাপত্তা চেকপয়েন্টে এটি দ্রুত পরিচয় যাচাইয়ে সাহায্য করে। ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার ফলে কাগজপত্র হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কমেছে।

 

স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হজ মৌসুমে তীব্র গরমপানিশূন্যতাক্লান্তি ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকি থাকে। বর্তমানে স্মার্ট ব্রেসলেট বা ওয়্যারেবল ডিভাইসের মাধ্যমে হাজিদের হার্টবিটশরীরের তাপমাত্রা ও রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষত বয়স্ক হাজিদের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী। জরুরি পরিস্থিতিতে এ ডিভাইস থেকেই সিগন্যাল পাঠানো যায়। সেহাতি’ (Sehhaty) সেবার মাধ্যমে ভিডিও কলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। 

 

হজে স্মার্ট পরিবহন ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। ইলেকট্রিক স্মার্ট বাসডিজিটাল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণজিপিএস ট্র্যাকিং এবং হারামাইন হাই-স্পিড রেল লাখো হাজির চলাচল সহজ করেছে। একজন হাজি এখন মোবাইল অ্যাপ থেকেই ট্রেনের টিকিট কাটারুট দেখা ও সময়সূচি জানতে পারেন।

হারামাইন শরিফাইনে এআই-চালিত স্মার্ট রোবটও ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব রোবট হাজিদের প্রশ্নের উত্তর দেয়পথনির্দেশনা দেয়জমজমের পানি বিতরণ করে এবং ধর্মীয় বই সরবরাহে সহায়তা করে। বহুভাষিক প্রযুক্তির কারণে বিভিন্ন দেশের হাজিরা সহজে উপকৃত হচ্ছেন।

 

তবে প্রযুক্তির এ অভূতপূর্ব উন্নতির মাঝেও কিছু উদ্বেগ রয়েছে। এখন অনেক হাজি ইবাদতের সময় অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারছবি তোলালাইভ ভিডিও করা কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাওয়াফের সময়ও অনেককে সেলফি তুলতে দেখা যায়। হজ মূলত আত্মসমর্পণবিনয় ও আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন হওয়ার শিক্ষা দেয়। কিন্তু প্রযুক্তি যদি মানুষকে আত্মপ্রদর্শন বা বাহ্যিক প্রচারের দিকে নিয়ে যায়তবে তা ইবাদতের মৌলিকত্ব ক্ষুণ্ণ করতে পারে।

মহান আল্লাহ আমাদের সব ধরনের লৌকিকতামুক্ত থেকে প্রযুক্তির সেবা গ্রহণ করার মানসিক শক্তি দান করুন। আমীন।