Image description

নারী ও শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের দায়ে সম্প্রতি লন্ডনে যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত সাবেক ইমাম আব্দুল হালিম খানকে (৫৪) বাংলাদেশী বলে বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম খবর প্রকাশ করেছে।

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, সাজাপ্রাপ্ত সেই ইমাম আব্দুল হালিম বাংলাদেশী নন। বরং তিনি ভারতীয় নাগরিক। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তিনি ১৯৯০ এর দশকের শুরুতে ভারত থেকে যুক্তরাজ্যে আসেন এবং ১৯৯৬ সালে একটি মসজিদে ইমাম হিসেবে নিয়োগ পান। ভারতে জন্ম নিলেও তিনি মূলত টাওয়ার হ্যামলেটসের বাংলাদেশি কমিউনিটির মুসল্লিদের মাঝেই ধর্মপ্রচার করতেন।

বাংলাদেশী সংবাদমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য

বিবিসি বাংলার বরাত দিয়ে ঢাকা ট্রিবিউন প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম ছিল ‘‘যৌন নিপীড়নের দায়ে বাংলাদেশি ইমামের লন্ডনে যাবজ্জীবন কারাদন্ড’’।  তবে সংবাদের শিরোনাম ছাড়া কোথাও বাংলাদেশী পরিচয় উল্লেখ করেনি সংবাদমাধ্যমটি।  

উল্লেখ্য, বিবিসির বাংলার খবরেও সেই ইমামকে বাংলাদেশী বলে পরিচয় দেওয়া হয়নি। তবে  বিচারকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে সেই ইমাম বিশেষভাবে বাংলাদেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের নারী ও মেয়েদের লক্ষ্যবস্তু বানাতেন।

এছাড়াও প্রায় একই ধরণের শিরোনাম ও খবর প্রকাশ করেছে আজকের পত্রিকা, ডেল্টা লেনসভয়েস বাংলাবিডিডাইজেস্ট বাংলাবিডিডাইজেস্ট ইংরেজিনওরোজ সহ বাংলাদেশী অনেক সংবাদমাধ্যম। 

ঢাকা ট্রিবিউনের খবর হুবহু কপি পেস্ট করে প্রকাশ করেছে ভোরের আকাশ নামে একটি অনলাইন পোর্টাল। 

আরও  কিছু অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যমেও এই খবর প্রকাশ করা হয়েছে। দেখুন: এখানেএখানেএখানেএখানেএখানেএখানেএখানেএখানে

এদিকে বাংলা ট্রিবিউন প্রথমে সাজাপ্রাপ্ত ইমামকে বাংলাদেশী বলে পরিচয় দিলেও পরে তা সংশোধন করে। প্রকাশিত সংবাদের শেষে সংশোধনী অংশে লিখেছে, ‘‘নিউজে আব্দুল হালিম খানের পরিচয় বাংলাদেশি বলে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তবে পরে জানা যায়, তিনি বাংলাদেশি নন। বিষয়টি পরে সংশোধন করা হয়েছে। ’’

শুধু সংবাদমাধ্যমেই নয়। এই খবর ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। দেখুন এখানেএখানেএখানে ও এখানে

কে এই আব্দুল হালিম খান?

ব্রিটিশ, ভারতীয় সহ অন্যান্য এবং বাংলাদেশেরও কিছু সংবাদমাধ্যমে আব্দুল হালিমকে ভারতীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের একটি খবরে বলা হয়েছে, ‘‘৫৪ বছর বয়সী এই সাবেক ইমাম আব্দুল হালিম খান ১৯৯০ এর দশকের শুরুর দিকে ভারত থেকে ব্রিটেনে আসেন এবং ১৯৯৬ সালে একটি মসজিদে নিয়োগ পান। নাইন-ইলেভেন (৯/১১) হামলার পর বিদেশি ইমামদের ওপর কঠোর নিয়মকানুন আরোপ করার আগেই তিনি এই নিয়োগ পেয়েছিলেন।’’

‘‘ভারতে জন্ম নিলেও তিনি মূলত টাওয়ার হ্যামলেটসের বাংলাদেশি কমিউনিটির মুসল্লিদের মাঝেই ধর্মপ্রচার করতেন বলে জানা গেছে। এই এলাকায় বাংলাদেশিদের বসবাসের ইতিহাস সেই ১৯৬০ এর দশক থেকে বিস্তৃত।’’ দ্য টেলিগ্রাফের সূত্র ধরে সংবাদ একই প্রকাশ করেছে বাংলাদেশী সংবাদমাধ্যম ডেইলি সানও। তাছাড়া আরটিভি ইন্টারন্যাশনালের ফেসবুক পেজে ‘‘লন্ডনে শিশু ধর্ষণের দায়ে এক ভারতীয় নাগরিকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড’’ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

অনলাইন পোর্টাল রাজনীতি.কম এ বিবিসির সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের ফেসবুক পোস্ট ‍উল্লেখ করেছে। তিনি লিখেছেন, ‘তিনি বাংলাদেশি নন, ভারতীয়। খুব ভালো বাংলা বলতে পারেন বলে অনেকেই তাকে বাংলাদেশি বলে মনে করতেন। পূর্ব লন্ডন মূলত বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় তার ওঠাবসা ছিল বাংলাদেশিদের সঙ্গে। বাংলাদেশি পরিবারের ছেলেমেয়েদের তিনি মসজিদে আরবি পড়াতেন।’ 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য উইক শিরোনাম করেছে, ‘‘আবদুল হালিম খান: বাংলাদেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের ৭ নারী ও শিশুকে ধর্ষণের দায়ে যুক্তরাজ্যে ভারতীয় ইমামের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড’’। 

ইন্ডিয়া টুডে শিরোনাম করেছে,‘‘যুক্তরাজ্যে জিনের কথা বলে ৭ নারী ও কিশোরীকে ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ, ভারতীয় ইমামের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড’’

ইয়াহো নিউজ লিখেছে, ‘‘পূর্ব লন্ডনের বাসিন্দা এই ভারতীয় নাগরিক একটি মসজিদের ইমাম ছিলেন। যিনি ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন ফ্ল্যাট এবং নির্জন, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা বিভিন্ন নির্জন স্থানে নিয়ে যেতে যেতেন।’’

জিও নিউজ শিরোনাম করেছে, ‘‘পূর্ব লন্ডনে বাংলাদেশি নারীদের ধর্ষণের দায়ে ভারতীয় ধর্মীয় নেতার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড’’

নিউজ ১৮ শিরোনাম করেছে, ‘‘জিন' তাড়ানোর অজুহাতে কিশোরীদের যৌন নির্যাতন, যুক্তরাজ্যে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ইমামের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড" 

এই সম্পর্কিত জিও নিউজের ব্রিটিশ ও ইউরোপ ব্যুরো চিফ তার ফেসবুক প্রোফাইলে তিনটি ভিডিও সাক্ষাৎকার পোস্ট করেছেন। সেখানেও দন্ডপ্রাপ্ত সাবেক ইমামকে ভারতীয় বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। ভিডিও দেখুন ()

যে কারণে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন আব্দুল আলিম খান

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে একাধিক তরুণী এবং কিশোরীকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগে সাবেক ইমাম আব্দুল আলিম খানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (ন্যূনতম ২০ বছর) দিয়েছে আদালত। গত বৃহস্পতিবার (১৩ ফেব্রুয়ারী) স্নেয়ারসব্রুক ক্রাউন কোর্টে তাকে হাজির করে লন্ডন নগর পুলিশ। হালিম সাতজন ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে ২১টি যৌন অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত হন, যার মধ্যে ৯টি ধর্ষণের অভিযোগ ছিল।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় বাঙালি কমিউনিটিতে ইমাম হিসেবে নিজের পদের অপব্যবহার করে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার ভান ধরে হালিম খান বিভিন্ন নারী ও কিশোরীদের যৌন নির্যাতন করতেন।

তদন্তের নেতৃত্বে থাকা লন্ডন নগর পুলিশের ডিটেকটিভ চিফ ইন্সপেক্টর জেনি রোনান বলেন, “আব্দুল হালিম খান নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। অথচ এটি ছিল সত্য থেকে অনেক দূরে। তিনি নারীদের ওপর শিকারের মত ঝাঁপিয়ে পড়তেন ও তাদের দুর্বলতার সুযোগ নিতেন।’’

পুলিশ জানায়, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম তারা হালিম খানের অপরাধ সম্পর্কে জানতে পারে। সে সময় সবচেয়ে কম বয়সী ভুক্তভোগী তার স্কুলের একজন শিক্ষকের কাছে হালিম খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে।

অভিযোগের পর নগর পুলিশের গোয়েন্দারা হালিমের বিরুদ্ধে মামলা সাজাতে শুরু করেন। তদন্তের অংশ হিসেবে, কর্মকর্তারা ৫০ জনেরও বেশি সাক্ষীর সাক্ষাৎকার নেন এবং ১০টি মোবাইল ফোন ডিভাইস পরীক্ষা করেন।

তবে জিজ্ঞাসাবাদে হালিম খান বারবার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এটি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। 

পরে তদন্তের পর হালিম খানের বিরুদ্ধে ৯টি ধর্ষণের অভিযোগ, ৪টি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, ১২ বছরের কম বয়সি শিশুর উপর দুটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, ১২ বছরের কম বয়সি শিশুকে পাঁচটি ধর্ষণের অভিযোগ এবং একটি ‘অনুপ্রবেশমূলক আক্রমণের’ অভিযোগ প্রমাণিত হয়।