Image description

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান জন্মনিয়ন্ত্রণকে একটি ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ এবং দেশটির জন্মহার কমে যাওয়াকে ‘বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তুরস্কের শীর্ষ রাজনীতিবিদ হিসেবে তার ২৩ বছরের মেয়াদের বেশির ভাগ সময়ই তিনি তুর্কিদের বেশি সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং ঐতিহ্যবাহী পরিবার ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন। যেখানে বাবারা উপার্জনকে এবং মায়েরা ঘরের পাশাপাশি অন্তত তিনটি বা তার বেশি সন্তানের প্রতি মনোযোগ দেবেন।

সম্প্রতি এরদোয়ান বলেন, ‘কেন অন্তত চার বা পাঁচটি সন্তান নয়?’

তার মতে, অধিক জন্মহার তুরস্ককে ‘ভবিষ্যতে আরো শক্তিশালীভাবে এগিয়ে যেতে’ সক্ষম করবে।

তবে এরদোয়ানের এই আহ্বান কাজে আসছে না। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তুরস্কের মোট প্রজনন হার (একজন নারী গড়ে যে কয়টি সন্তানের জন্ম দেন) কমছে। বর্তমানে এই হার ২.১-এর চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নেমে গেছে, যা কোনো অভিবাসন ছাড়াই জনসংখ্যাকে স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয়।

জনমিতিবিদরা (ডেমোগ্রাফার) এই পতনের জন্য বিশ্বজুড়ে দেখা যাওয়া সাধারণ কিছু কারণকে দায়ী করছেন, যেমন-নগরায়ণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং বিশেষ করে নারীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার প্রসার।

পাশাপাশি তারা এরদোয়ানের অর্থনৈতিক নীতির ফলে তৈরি হওয়া বর্তমান অর্থনীতিকেও দায়ী করছেন। ক্রমাগত উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কম মজুরির কারণে অনেক পরিবার আবাসন, শিশু যত্ন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।

ইস্তাম্বুলের ৪১ বছর বয়সী দুই সন্তানের জননী চিগদেম আকইউজ বলেন, ‘খাবার খুবই ব্যয়বহুল।’

তিনি তৃতীয় সন্তান চেয়েছিলেন, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই খরচ চালানো অসম্ভব বলে মনে করেন।

এরদোয়ানের আহ্বানকে অবাস্তব আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি ক্রমাগত বলেই যাচ্ছেন আরো সন্তান নাও! তিনটি বাচ্চা নাও! কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব?’

যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশেই জন্মহার কমছে, যা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কর্মক্ষম মানুষের অভাব, পেনশন তহবিল দেউলিয়া হওয়া এবং অর্থনীতি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। তবে এরদোয়ানের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রপ্রধান খুব কম দেশেই আছেন, যিনি মানুষকে বেশি সন্তান নিতে রাজি করাকে নিজের ব্যক্তিগত মিশন হিসেবে নিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এরদোয়ানের এই উদ্যোগের পেছনে কেবল অর্থনৈতিক উদ্বেগই নয়, বরং তুর্কি সমাজের জন্য একটি রক্ষণশীল ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিও কাজ করছে। তার এই লক্ষ্যগুলোর মধ্যে এমন দম্পতিদের স্থান নেই যারা সন্তান চান না এবং এলজিবিটিকিউ দম্পতিদের জন্যও কোনো সুযোগ নেই। এমনকি ক্যারিয়ার সচেতন নারীদের জন্যও এখানে সুযোগ সীমিত।

২০২২ সালে সংসদে এক নতুন সংসদ সদস্যকে স্বাগত জানানোর সময় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক আলাপে এরদোয়ান সেই সদস্য মেহমেত আলি চেলেবিকে জিজ্ঞেস করেন, তার কয়টি সন্তান। চেলেবি ‘একটি’ বললে রাষ্ট্রপতি অসন্তুষ্ট হন।

চেলেবি তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত করে জানান, তার স্ত্রী ক্যারিয়ার সচেতন এবং পিএইচডিধারী। কিন্তু এরদোয়ান তাতে প্রভাবিত না হয়ে বলেন, ‘সন্তান হওয়াই হলো ক্যারিয়ার। আমাদের সংখ্যা বাড়াতে হবে।’

তুরস্কের জন্মহার বিশ্বের সর্বনিম্ন না হলেও এর পতনের গতি বেশ দ্রুত। ২০০০-এর দশকের শুরুতে এটি ২ দশমিক ১-এর ওপরে ছিল। ২০১৭ সালে এটি প্রতিস্থাপন স্তরের (রিপ্লেসমেন্ট লেভেল) নিচে নেমে যায়। ২০২৪ সালে, যা সরকারের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যানের বছর, এই প্রজনন হার সর্বকালের সর্বনিম্ন ১ দশমিক ৪৮-এ পৌঁছেছে।

এই জনমিতিক ধারা পরিবর্তনের আশায় এরদোয়ান সরকার প্রজননকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার ২০২৫ সালকে ‘পরিবার বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং চলতি বছর থেকে শুরু হয়েছে ‘পরিবার ও জনসংখ্যা দশক’, যা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত চলবে।

চলতি মাসে সরকার মায়েদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ১৬ সপ্তাহ থেকে বাড়িয়ে ২৪ সপ্তাহ এবং বাবাদের ছুটি ৫ দিন থেকে বাড়িয়ে ১০ দিন করেছে।

নতুন নীতি অনুযায়ী, প্রথম সন্তানের জন্মের পর দম্পতিরা প্রায় ১১০ ডলার পাবেন। একাধিক সন্তান থাকলে মাসিক ভাতা দেওয়া হবে, দ্বিতীয় সন্তানের জন্য ৩৩ ডলার এবং পরবর্তী সন্তানদের জন্য ১১০ ডলার। তরুণ দম্পতিরা বিয়ের খরচ মেটাতে সুদমুক্ত ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

তবে সাক্ষাৎকার দেওয়া অভিভাবকেরা জানিয়েছেন, জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে এই প্রণোদনাগুলো পরিবার পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলার জন্য খুবই সামান্য। তুরস্কে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৩০ শতাংশের নিচে নামেনি এবং কখনো কখনো তা ৮০ শতাংশও ছাড়িয়ে গেছে, যা পারিবারিক বাজেটকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

৩৮ বছর বয়সী জাহিদে এরতে তার চতুর্থ সন্তানের (৮ মাস বয়সি) জন্য সরকারের কাছ থেকে প্রতি মাসে ১১০ ডলার পান। তিনি বলেন, ‘এটি কেবল ডায়াপার কেনার জন্যই যথেষ্ট।’

তার স্বামী একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন এবং প্রায় অর্ধেক তুর্কি শ্রমিকের মতো তিনিও ন্যূনতম মজুরি পান, যা প্রায় ৬২৫ ডলার।

গত মাসে একটি বড় তুর্কি ট্রেড ইউনিয়ন জানায়, মূল্যস্ফীতির কারণে ন্যূনতম মজুরি মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছে।

এরতের পরিবার একটি দুই বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টে ঠাসাঠাসি করে থাকে, যা বড় করার সামর্থ্য তাদের নেই। তিনি বলেন, ‘আমরা আগে মাসে একবার বাইরে খেতাম, এখন আর পারি না।’

জনমিতিবিদরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে সরকারের এই প্রণোদনা জন্মহারে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে। আঙ্কারা সোশ্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানী সুতয় ইয়াভুজ বলেন, ‘আমার ধারণা এগুলো পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারবে না।’

তিনি জানান, বর্তমান প্রজন্মের তুর্কিরা শহরে বসবাস করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকা এবং সন্তান নেওয়ার আগে ক্যারিয়ার শুরু করার ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহী। ফলে বিয়ের বয়স বাড়ছে এবং সন্তানের সংখ্যা কমছে। তরুণ প্রজন্মের নতুন তুর্কি পরিবারগুলো এক সন্তানের পরিবারে পরিণত হচ্ছে এবং বর্তমানে একটি সন্তানসহ স্বামী-স্ত্রী উভয়ের আয়কেই আদর্শ মনে করা হচ্ছে।

চার সন্তানের জনক এরদোয়ান বছরের পর বছর ধরে তুর্কিদের অন্তত তিনটি সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানালেও পারিবারিক নীতি নিয়ে কাজ করা কর্মকর্তারাও তা মেনে চলেননি।

তুরস্কের পরিবার ও সামাজিক সেবা বিষয়ক মন্ত্রী মাহিনুর ওজদেমির গোকতাস-এর দুটি সন্তান রয়েছে। গত মার্চ মাসে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি জনসংখ্যা বিষয়টিকে ‘টিকে থাকার লড়াই’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ হলো পরিবার।’

তিনি উল্লেখ করেন, অন্য দেশে যে জন্মহার কমতে ৯ দশক লেগেছে, তুরস্কে তা মাত্র ২৭ বছরে ঘটেছে।

এরদোয়ানের ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির সিনিয়র আইনপ্রণেতা লেয়লা শাহিন উস্তা (যিনি নিজে একজন চিকিৎসক ও রাজনীতিক এবং তার দুটি সন্তান রয়েছে) স্বীকার করেছেন যে ধনী ব্যক্তিরা কম সন্তান নেওয়ার প্রবণতা দেখান।

তবে তিনি মনে করেন অন্যদের তিনটি সন্তান নেওয়া উচিত এবং মানুষের মধ্যে এই চেতনা থাকা দরকার যে দেশ ও জাতির এটি প্রয়োজন।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের নির্দেশনা মেনে যারা বেশি সন্তান নিয়েছেন, তারা জানিয়েছেন জীবন বেশ কঠিন। তিন সন্তানের জননী ৩৯ বছর বয়সী ফাতমা আভচি বলেন, ‘আমরা বেঁচে আছি, কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করেন আমরা ছুটিতে যাই কি-না, আমি বলব না।’

তার স্বামী একজন ইলেকট্রিশিয়ান এবং সন্তান বড় করার জন্য তিনি নিজে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের সন্তানরা বড় হয়ে যাওয়ায় তারা সরকারি কোনো ভাতাও পান না। তারা একটি এক বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন এবং বসার ঘরের সোফায় সন্তানদের ঘুমাতে হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তরুণ দম্পতিদের সর্বোচ্চ দুটি সন্তান নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কারণ জীবন চালানো খুবই কঠিন।’

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস