ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর ছক কষছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ সামরিক নেতারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদন পেলে আবারও ইরানে হামলা শুরু করবে তারা। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ‘সিরিয়াস’ হলেই পরবর্তী ধাপের আলোচনায় বসার ইঙ্গিত দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ আবার শুরুর সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন। গত মাসে প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পর সাময়িকভাবে এ অভিযান স্থগিত করা হয়েছিল। তাই এবার এটি নতুন কোনো নামেও শুরু হতে পারে। অভিযান-সংক্রান্ত আলোচনার বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াশিংটন পোস্টকে মধ্যপ্রাচ্যের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলা আবার শুরুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এটাকে সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি বলে মনে হচ্ছে।
ট্রাম্প আবার সামরিক হামলা শুরুর সিদ্ধান্ত নিলে ইরানের সামরিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আরও জোরালো বোমা হামলা চালানো হবে। কর্মকর্তারা বলেন, অন্য একটি বিকল্প হতে পারে, মাটির গভীরে লুকিয়ে রাখা পারমাণবিক উপাদানগুলো ধ্বংস করতে স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সকে (বিশেষ অভিযান চালাতে দক্ষ বাহিনী) মাটিতে নামানো। ট্রাম্পকে এ বিকল্প দেওয়ার উদ্দেশ্যেই গত মার্চে বিশেষ অভিযানে দক্ষ বাহিনীর কয়েক শ সদস্য মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছান। বিশেষায়িত পদাতিক সেনা হিসেবে ইস্পাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে লক্ষ্য করে চালানো অভিযানে তাদের ব্যবহার করা হতে পারে। তবে এ ধরনের অভিযানের জন্য হাজার হাজার সহায়ক সেনার প্রয়োজন হবে, যারা সম্ভবত একটি নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করবে এবং ইরানি সেনাদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। এ বিকল্পে বিপুল পরিমাণ প্রাণহানির বড় ঝুঁকি রয়েছে। এদিকে ইরানের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, তাদের নেতারাও যুদ্ধাবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে জানান, যেকোনো আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত। ভুল কৌশল ও ভুল সিদ্ধান্ত সব সময় ভুল ফলাফল বয়ে আনে। পুরো বিশ্ব ইতোমধ্যেই তা বুঝতে পেরেছে। আমরা সব ধরনের বিকল্পের জন্য প্রস্তুত; তারা বিস্মিত হবে। অপরদিকে ইরানের সঙ্গে আলোচনার শর্ত নিয়ে সুর নরম করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পারমাণবিক কর্মসূচি ২০ বছরের জন্য স্থগিত করলেই ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্ভব বলে জানিয়েছেন তিনি। এর আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধের শর্ত দিয়েছিলেন ট্রাম্প। চীন সফর শেষে দেশে ফিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি ২০ বছরের জন্য স্থগিত করলে তিনি তা মেনে নেবেন। এটি ‘সত্যিকার অর্থে ২০ বছর’ হতে হবে। যদিও তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতার কথা উল্লেখ করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তেহরান কেবল তখনই ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী, যখন যুক্তরাষ্ট্র ‘সিরিয়াস’ (সত্যিকারের আন্তরিক) হয়।
গতকাল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরস্পরবিরোধী বার্তা ওয়াশিংটনের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে ইরানের মনে সন্দেহ তৈরি করেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়নি। তবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। কূটনীতিকে একটি সুযোগ দিতে ইরান এখনো যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে, তবে আমরা আবার লড়াইয়ে ফিরে যেতেও প্রস্তুত। বেইজিংয়ের মধ্যস্থতার বিষয়ে তেহরান সম্মত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, যাদের সাহায্য করার সক্ষমতা রয়েছে, এমন যে কোনো দেশের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানায় ইরান। আরাগচি আরও বলেন, ইরানের নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করলে তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকা দেশগুলো ছাড়া বাকি সব জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে। তিনি বলেন, বিশ্ব জ্বালানি ও পণ্য বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথের চারপাশের পরিস্থিতি খুবই জটিল। আলোচনার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা একটি ভালো সিদ্ধান্তে পৌঁছাব, যাতে হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করা যায় এবং আমরা এ প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারি।
আরও ৪৫ দিন বাড়ল ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতি : যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি আরও ৪৫ দিন বৃদ্ধি করা হয়েছে। গতকাল ওয়াশিংটনে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সংলাপ শেষে এ ঘোষণা দেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র টমি পিগোট। সামাজিকমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, গত ১৬ এপ্রিল কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ রবিবার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নতুন আলোচনার মাধ্যমে তা আরও ৪৫ দিনের জন্য বাড়ানো হয়েছে। দুই দিনের এই সংলাপ ছিল অত্যন্ত ফলপ্রসূ এবং এতে উভয় দেশের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও অংশ নেন।