নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগরীয় দেশ কাতারের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি বা জ্বালানি খাত মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ অবরুদ্ধ থাকায় এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কারণে দোহার পক্ষে এই ধাক্কা সামলে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কাতারের বাসিন্দাদের কাছে আটকে পড়া গ্যাসবাহী বিশাল ট্যাঙ্কার ‘রাশিদা’ এখন এক দীর্ঘশ্বাসের নাম। দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে জাহাজটি পারস্য উপসাগরের একই জায়গায় বৃত্তাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্থানীয়রা এখন সামুদ্রিক ট্র্যাকিং অ্যাপে এই জাহাজের অবস্থান দেখে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের তীব্রতা অনুমান করছেন। এই অচলাবস্থার কারণে কাতারের যেমন শত শত কোটি ডলারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, ঠিক তেমনি বিশ্বজুড়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মার্চ মাসে কাতারের প্রধান এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র ‘রাস লাফান’-এ ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জ্বালানি অবকাঠামোর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়। অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করা হলেও ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩টি ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে মূল স্থাপনায় আঘাত হানে।
হামলার ভয়াবহতা বর্ণনা করে ওই কেন্দ্রের সাবেক প্রকৌশলী রশিদ আল-মোহানাদি বলেন, "বিস্ফোরণের তীব্রতায় দোহার বাইরে আমার বাড়ির দরজা-জানালা পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল। বাইরে তাকিয়ে দেখি দিগন্তজুড়ে শুধু কালো ধোঁয়া। তখনই বুঝেছিলাম বড় কোনো বিপর্যয় ঘটে গেছে।"
ক্ষতিগ্রস্ত দুটি ইউনিট থেকে রাস লাফানের মোট উৎপাদনের প্রায় ১৭ শতাংশ সরবরাহ করা হতো। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘কাতার এনার্জি’ জানিয়েছে, এই ইউনিটগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যেতে পারে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালির আশপাশে এলএনজি, তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যবাহী প্রায় ১,৬০০ জাহাজ আটকা পড়ে আছে। কোনো কোনো জাহাজ পাকিস্তানি পতাকার ছদ্মবেশ নিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যুদ্ধবিরতি হলেও এই রুটে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া কঠিন। কারণ তেহরান এই নৌপথে পানির নিচে মাইন বা বিস্ফোরক পুঁতে রাখার দাবি করেছে। আন্তর্জাতিক মাইন অপসারণকারী দল বা ইরান সরকার নিজে থেকে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত কোনো শিপিং কোম্পানি তাদের নাবিকদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে চাইছে না।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি যদি দ্রুত খুলেও দেওয়া হয়, তাহলেও কাতারের এলএনজি রপ্তানি সচল হতে কয়েক মাস এবং পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে বহু বছর লেগে যাবে। এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট এড়াতে এখন মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি মানচিত্র বদলে নতুন বিকল্প পথ খোঁজার আলোচনা জোরালো হচ্ছে।
শীর্ষনিউজ