Image description

১৭৬৫ সালে ব্রিটিশরা বাংলার দেওয়ানি অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের কর্তৃত্ব লাভ করে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে বাংলার স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের কোনো আশা তখন অবশিষ্ট ছিল না। এ অবস্থায় বাংলার অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবার দেশ ছেড়ে চলে যেতে শুরু করে। তারা বিভিন্ন স্বাধীন রাজ্যে আশ্রয় নেয়। সে সময় বর্তমান সিলেট জেলার উত্তরাঞ্চল এবং ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত জৈন্তিয়া রাজ্য ব্রিটিশ কর্তৃত্বের বাইরে ছিল।

 

জৈন্তিয়া হাজার হাজার বছরের পুরোনো স্বাধীন রাজ্য। প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত সুরক্ষিত ও স্বাধীনচেতা পাহাড়ি জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত হওয়ায় ব্রিটিশরা তখনো এই রাজ্য দখল করতে পারেনি। তাই ব্রিটিশদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে বাংলার বহু মুসলিম পরিবার তখন স্বাধীন জৈন্তিয়া রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছিল।

 

জৈন্তিয়া-মোগলান সম্পর্ক

জৈন্তিয়ার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ব্রিটিশদের পছন্দ করত না। তাদের চোখে ব্রিটিশরা ছিল আগ্রাসী ও বিদেশি শক্তি। তবে ব্রিটিশদের পূর্ববর্তী মোগলদের ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। জৈন্তিয়া-মোগলান সম্পর্ক খুবই ভালো ছিল। বাংলার মোগল রাজপরিবার এবং জৈন্তিয়ার রাজপরিবারের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিল।

বাংলার নবাব আলীবর্দী খাঁর ভাতিজা নওয়াজিশ মোহাম্মদ খাঁ ছিলেন ঢাকার নবাব। তিনি আনুমানিক ১৭৪০ সালে জৈন্তিয়ার রাজা দ্বিতীয় বড়গোসাঁইয়ের বোন ভৈরবী কুওরীকে বিয়ে করেছিলেন। তখন থেকে উভয়পক্ষের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল। ১৭৫৫ সালে নওয়াজিশের মৃত্যুর পর ভৈরবী কুওরী একমাত্র পুত্র ফতেহ খাঁকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করছিলেন। এর দুবছর পর ব্রিটিশদের হাতে বাংলার পতন হয়।

ফতেহ খাঁর জৈন্তিয়া রাজ্যে হিজরত

ভৈরবী কুওরী তখন থেকে ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় ভুগছিলেন। ১৭৬৫ সালে তার আশঙ্কাই সত্যি হলো; ব্রিটিশদের হাতে দেওয়ানি চলে যাওয়ায় ঢাকা ও মুর্শিদাবাদের সম্ভ্রান্ত মুসলমানরা নিঃস্ব হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় ভৈরবী কুওরী ও ফতেহ খাঁ সিদ্ধান্ত নেন, তারা ব্রিটিশ শাসনের বাইরে স্বাধীন জৈন্তিয়া রাজ্যে চলে যাবেন। যাত্রার সময় আরো অনেকে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এদের মধ্যে ছিলেন বাংলার নবাব পরিবারের ধর্মীয় নেতা হজরত কাশিম শাহ মুর্শিদাবাদী, নবাব আলীবর্দী খাঁর দূর সম্পর্কের ভাতিজা মোহাম্মদ খাঁ ওরফে সোনা খাঁ এবং পহহার খাঁ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তি। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, ঢাকা থেকে জৈন্তিয়ায় আশ্রয়প্রার্থী এই দলে লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ৭০০। তারা একটি বিশাল নৌবহর নিয়ে ১৭৬৫ সালের শেষের দিকে কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার নদীপথ হয়ে জৈন্তিয়া রাজ্যে পৌঁছেছিলেন।

জৈন্তিয়ার রাজা দ্বিতীয় বড়গোসাঁই (শাসনকাল: ১৭৩১-১৭৭০ সাল) ছিলেন পাহাড়ি সিন্টেং জনগোষ্ঠীর মানুষ। সিন্টেংরা বাংলাদেশে খাসিয়া সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। তাই জৈন্তিয়ার রাজাদের আজও ‘খাসিয়া রাজা’ ডাকা হয়। খাসিয়ারা একটি মাতৃকুলভিত্তিক জনগোষ্ঠী। কোনো খাসিয়া রাজার মৃত্যু হলে তার ভাগনে হতো নতুন রাজা। এই নিয়মানুসারে ফতেহ খাঁ ছিলেন রাজা বড়গোসাঁইয়ের সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী। ভৈরবী কুওরী রাজা ফতেহ খাঁকে সেভাবেই গড়ে তুলতে থাকেন।

ফতেহ খাঁর হত্যাকাণ্ড

জৈন্তিয়া রাজ্যের ২২ জন দলই (পুঞ্জি বা পরগনার রাজ প্রতিনিধি) ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী; রাজ্য পরিচালনায় তারা সরাসরিই অংশ নিতেন। ফতেহ খাঁ ঢাকা ও মুর্শিদাবাদ থেকে আগত লোকদের দিয়ে সবকিছু পরিচালনা করছিলেন; দলইদের ওপর তার তেমন কোনো নির্ভরতা ছিল না। নবাগত লোকজনদের হাতে রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় দলইরা মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। তারা ফতেহ খাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠলেন।

তারা সুকৌশলে রাজা ও ফতেহ খাঁর সম্পর্কে ফাটল ধরিয়ে দিলেন। ফতেহ খাঁর সঙ্গে রাজার ভুল বোঝাবুঝি চরম পর্যায়ে উপনীত হলে রাজা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে মৃত্যুদণ্ড দিলেন। এর কিছুদিন পর রাজা প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করে মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন। তিনি নিজের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত হলেন এবং প্রায়শ্চিত্তের পথ খুঁজতে লাগলেন।

জৈন্তিয়া রাজ্যে মুসলিম স্থাপনা

‘রাজার বানানো বন্দরহাটি মসজিদ’

ফতেহ খাঁর হত্যাকাণ্ডে জৈন্তিয়ার মুসলমানরা নাখোশ হলেন। অনুতপ্ত রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন, ফতেহ খাঁকে হত্যার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তিনি জৈন্তিয়ার মুসলমানদের জন্য রাজধানী জয়ন্তাপুরের প্রাণকেন্দ্র বন্দরহাটিতে একটি বিশাল মসজিদ বানিয়ে দেবেন। ১৭৬৭ সালে মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৭৬৯ সালে মসজিদটি পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত হয়ে গেলে রাজা হজরত কাশিম শাহকে এর দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। এই অপূর্ব স্থাপনাটি ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত জৈন্তিয়ার মুসলমানদের গৌরব হিসেবে জয়ন্তাপুরের কেন্দ্রস্থলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। আকারে অনেক বড় হওয়ায় ওই বছরের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে মসজিদটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

এরপর বারবার সংস্কারের ফলে মূল মসজিদটি ক্রমেই বিলীন হতে থাকে। ২০০০ সালে মূল মসজিদটির সর্বশেষ অংশটুকুও বিলুপ্ত হয়ে যায়। বর্তমানে মূল মসজিদের স্থলে সম্পূর্ণ নতুন একটি মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে। তবে মসজিদ হিসেবে এটিই জৈন্তিয়ার সবচেয়ে পুরোনো মসজিদ। আজও এটি লোকজনের কাছে ‘রাজার বানানো বন্দরহাটি মসজিদ’ হিসেবেই পরিচিত।

শাহজির মোকাম

বন্দরহাটি মসজিদের মূল ভবন বিলুপ্ত হয়ে গেলেও জৈন্তিয়া রাজ্যের অন্যান্য মুসলিম স্থাপনা আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে আজও টিকে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো হজরত শাহজির মোকাম। এই স্থাপনাটি পুরোপুরি অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে এর তেমন ক্ষতি হয়নি। জৈন্তিয়া রাজ্যের হাতেগোনা অক্ষত স্থাপনার মধ্যে এটি অন্যতম।

হজরত শাহজি ছিলেন হজরত কাশিম শাহের মুরিদ ও খলিফা। কাশিম শাহের মৃত্যুর পর তিনি বন্দরহাটি মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি জৈন্তিয়ার রাজাদের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও আনুকূল্য পেতেন। তার মৃত্যু হয়েছিল আনুমানিক ১৭৮৬ সালে (দু-এক বছর কমবেশি হতে পারে)। তখন জৈন্তিয়ার রাজা ছিলেন বিজয়নারায়ণ সিংহ (শাসনকাল: ১৭৮৫-১৭৮৮ সাল)। পূর্ববর্তী রাজাদের ধারাবাহিকতায় তিনিও মুসলমান ধর্মীয় নেতাদের সম্মান করতেন।

হজরত শাহজির মৃত্যুর পর তার কবরগাহে রাজা বিজয়নারায়ণ সিংহ অত্যন্ত নান্দনিক শৈলীতে দৃষ্টিনন্দন একটি স্থাপনা বা মোকাম নির্মাণ করেন। এর দক্ষিণের দেয়ালের মাঝখানে রয়েছে প্রবেশদ্বার। মোকামের ভেতরে হজরত শাহজির সঙ্গে আরো দুজন ব্যক্তি শায়িত রয়েছেন। তারা শাহজির খাদেম ছিলেন বলে জানা যায়।

হজরত শাহজির এক কন্যাকে এই কবরগাহের কাছেই দাফন করা হয়। মূল কবরগাহের বাইরে এক অজানা ব্যক্তির পাশে তার কন্যার কবর রয়েছে। অজানা ব্যক্তি এবং শাহজির কন্যার কবর—দুটোই বেশ সুন্দরভাবে বাঁধাই করা। কবরগাহের বাইরের এই অংশটি বাঁধাই করে দিয়েছিলেন রাজা দ্বিতীয় রামসিংহ (শাসনকাল: ১৭৯০-১৮৩২ সাল)।

হজরত কাশিম শাহর বসতবাড়ি

জৈন্তিয়ার ইসলামধর্মীয় নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পেয়েছিলেন হজরত কাশিম শাহ। ১৭৬৫ সালে জৈন্তিয়ায় আগমনের পর রাজা বড়গোসাঁই তাকে একটি বাড়ি এবং জমিদারি দান করেন। তিনি রাজদরবারের বিচারকের মর্যাদাও লাভ করেন। বাংলার নবাব পরিবারের মান্যবর ব্যক্তি, ফতেহ খাঁর ওস্তাদ ও পির হওয়ায় রাজা বড়গোসাঁই তাকে অত্যন্ত আপন করে নিয়েছিলেন। তাকে ছয়টি মৌজার জমিদারি (চেরাগি মহাল) দিয়েছিলেন। বসবাসের সুবিধার জন্য রাজদরবারের পাশে তাকে একটি বাড়িও বানিয়ে দিয়েছিলেন। হজরত এই বাড়িটিকে জৈন্তিয়ার মুসলমানদের তালিম-তরবিয়তের কেন্দ্রে পরিণত করেন।

বাড়িটি ছিল একই সঙ্গে হজরতের বসতবাড়ি, খানকাহ এবং বিশুদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষা প্রচারের কেন্দ্র। বাড়ির একপাশে একটি পুরোনো মোকামের অস্তিত্ব থাকায় জনসাধারণের কাছে এটি ‘মোকামবাড়ি’ নামে পরিচিতি পায়। রাজা বড়গোসাঁই এখানে যে ঘরটি বানিয়ে দিয়েছিলেন, সেটির কোনো চিহ্ন এখন আর নেই। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে এটি ভেঙে যায়। এরপর ১৯১১ সালে আগুন লেগে আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯২৪-২৫ সালের দিকে হজরতের বংশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব সিকান্দার আলী খন্দকার পুরোনো বাড়ির ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করে সম্পূর্ণ নতুন একটি ঘর বানান। এই ঘরটি আজও টিকে আছে। রাজার হাতে নির্মিত পুরোনো বাড়িটি বিলুপ্ত হয়ে গেলেও বাড়ির ফটকটি আজও পুরোপুরি অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে। এই অপূর্ব নিদর্শনটি জৈন্তিয়া রাজ্যের একটি মূল্যবান প্রত্নসম্পদ হলেও মানুষের অবহেলায় এটি ক্রমেই সৌন্দর্য হারাচ্ছে।

অজানা মোকাম

যে মোকামের কারণে হজরত কাশিম শাহের বাড়িটিকে মোকামবাড়ি বলা হতো সেটিও একটি মূল্যবান মুসলিম স্থাপনা। মোকামটির আকার দেখে মনে হয় এর ভেতরে কয়েকজনের কবর রয়েছে। তবে কার বা কাদের কবর এখানে রয়েছে, সে ব্যাপারে জৈন্তিয়ার ইতিহাসে কোনো তথ্য নেই। জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাসের যেসব মূল্যবান তথ্য চিরতরে হারিয়ে গেছে তার মধ্যে এই মোকামে শায়িত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের পরিচয়ও রয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও জৈন্তিয়ার ইতিহাস গবেষকরা তাদের তথ্য উদ্ধার করতে পারেননি। রাজকীয়ভাবে নির্মিত ও রাজদরবারের একেবারে নিকটবর্তী হওয়ায় মোকামটি যে কোনো সাধারণ লোকের মোকাম নয়, তা বেশ সহজেই অনুমান করা যায়। যে বা যারা এখানে শায়িত আছেন, তারা তাদের সমসাময়িক রাজার কাছে বেশ সম্মানিত ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবেই গণ্য ছিলেন।

যে রাজা এই মোকামটি নির্মাণ করেছিলেন তার পরিচয়ও মেলেনি। শুধু এটুকুই নিশ্চিত হওয়া যায়, মোকামটি নির্মিত হয়েছিল ১৭৬৫ সালের আগে অর্থাৎ হজরত কাশিম শাহের জৈন্তিয়ায় আগমনের আগে। জৈন্তিয়ার রাজারা মুসলমান জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ (ধর্মীয়ভাবে কিংবা সামাজিকভাবে) ব্যক্তিদের খুবই সম্মান ও খাতির করতেন। হজরত কাশিম শাহের জৈন্তিয়ায় আগমনের বহু আগে থেকেই রাজাদের এমন মনোভাব ছিল। তার প্রমাণ এই মোকামটি। কাশিম শাহের মৃত্যুর পর তাকে এই মোকামের পাশে সমাহিত করাটাই ছিল স্বাভাবিক; কিন্তু তা হয়নি। কাশিম শাহকে সমাহিত করা হয়েছিল একটু দূরে, মোকামবাড়ির পশ্চিম পাশে। তবে কাশিম শাহের কয়েকজন বংশধরকে এই মোকামের পাশে সমাহিত করা হয়েছিল।