Image description

মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়ার জন্য সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-কে ৪৫ দিনের মধ্যে জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তার এমন সিদ্ধান্ত ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে কি না মঙ্গলবার (১২ মে) এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ‘সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষা আমাদের অগ্রাধিকার। এই সিদ্ধান্ত আমরা সেই দৃষ্টিতেই দেখি।’

 

তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এর প্রভাব পড়বে কি না, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফল বাংলাদেশে কোনো কোনো মহলে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে বলে প্রকাশিত খবরের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে জয়সওয়াল বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছি যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ভারত ইতিবাচক করে তুলতে চায়। ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে চায়। সেই মনোভাবের বদল হয়নি।’

 

পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার। এটি ভারতের যে কোনো রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘতম সীমান্ত। এই সীমান্ত উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা, দক্ষিণ দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার ঘেঁষা। সুদীর্ঘ এই সীমান্তের প্রায় ১ হাজার ৬৪৮ কিলোমিটার অংশে কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে এবং অবশিষ্ট প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার অংশে বেড়া দেওয়ার কাজ বাকি রয়েছে। এ জন্য প্রায় ৬০০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন।

 

ভারতীয় আইন অনুযায়ী, জমি অধিগ্রহণ পুরোটাই রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয়। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার জমি অধিগ্রহণ শুরু করলেও সীমান্ত এলাকার চাষিদের থেকে জমি অধিগ্রহণে স্থানীয় সমস্যা ও কেন্দ্রের সঙ্গে ক্ষতিপূরণের অর্থের সমস্যার জেরে অধিগ্রহণ বেশিদূর এগোতে পারেনি। পরে রাজ্যের ওপর চাপ বাড়িয়ে কলকাতা হাইকোর্টে যায় বিএসএফ।

 

কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্যকে দ্রুততম সময়ে জমি অধিগ্রহণ করে বিএসএফ-কে হস্তান্তরের নির্দেশ জারি করে। এর মধ্যেই বিধানসভা নির্বাচনে মমতা সরকারের পতন হয়, একই সঙ্গে বিপুল জনসমর্থনে জয়লাভ করে বিজেপি। এই প্রেক্ষাপটে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই বিএসএফ-কে জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ৪৫ দিনের মধ্যে শেষ করার জন্য নির্দেশ জারি করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

 

ফলে দুই দেশের সম্পর্কে আবারো টানাপোড়েন শুরু হলে এদিন সংবাদ সম্মেলনে পুনরায় অনুপ্রবেশ ইস্যু সামনে আসে। এক প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে যে যে বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় এটি (অনুপ্রবেশ) তার অন্যতম। ভারতে অবৈধভাবে বসবাস করছেন, এমন ২ হাজার ৮৬০ জনের বেশি মানুষের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশকে অনেক আগে অনুরোধ করা হয়েছে। ভারত মনে করে, তারা সবাই বাংলাদেশি। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো ওই বিষয়ে কিছু জানায়নি।’

 

ব্রিফিংয়ে তিস্তা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রসঙ্গও ওঠে। এক সাংবাদিক প্রশ্নে বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি চীন সফরে গিয়ে তিস্তা উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ নিতে তাদের অনুরোধ করেছেন বলে খবর প্রকাশ হয়েছে। বাংলাদেশের আগের সরকারের সিদ্ধান্ত (যেখানে ওই প্রকল্পের ভার ভারতকে নিতে বলা হয়েছিল) বদলে এই জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গাটা নষ্ট করে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে জয়সওয়াল বলেন, ‘বিশ্বের যেখানে যে কোনো স্থানে যে কোনো ঘটনার ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা হয়। এ ক্ষেত্রেও সেই নজর রয়েছে।’

 

তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে পারস্পরিক স্বার্থই প্রাধান্য পায়।

 

তবে বাংলাদেশের বাইরে এদিন ব্রিফিংয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর সময় পাকিস্তানকে সরাসরি চীনের সহযোগিতার বিষয়।

 

জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামের সন্ত্রাসী হামলার পর ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে সামরিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেই সময় চীন পাকিস্তানকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছিল বলে খবর সামনে আসে। মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে রণধীর জয়সওয়াল এই বিষয়ে মুখ খোলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এই সংক্রান্ত রিপোর্ট দেখেছি, যা আগে থেকেই জানা ছিল। সন্ত্রাসবাদে মদদ জোগায় এমন দেশগুলোকে সাহায্য করা ঠিক কি না, তা দায়িত্বশীল রাষ্ট্রগুলোর ভেবে দেখা উচিত।

 

তিনি বলেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’ ছিল পেহেলগামের সন্ত্রাসী হামলার একটি সুনির্দিষ্ট এবং নিয়ন্ত্রিত জবাব। এর মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান থেকে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো ধ্বংস করা।

 

তবে নিজের বক্তব্যে একবারও চীনের নাম নেননি রণধীর। তার কথায়, যেসব দেশ নিজেদের দায়িত্বশীল বলে দাবি করে, তাদের ভেবে দেখা উচিত, সন্ত্রাসী পরিকাঠামো রক্ষার চেষ্টা করার ফলে তাদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে কোনও প্রভাব পড়ছে কি না।

 

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২২ এপ্রিল পেহেলগামে ২৬ পর্যটককে গুলি করে খুন করে লস্কর-ই-তৈবার ছায়া সংগঠন টিআরপিএফের চার সন্ত্রাসী। এর পাল্টা ৭ মে ‘অপারেশন সিন্দুর’ শুরু করে ভারত। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় পাকিস্তানের একাধিক ‘সশস্ত্র’ ঘাঁটি। ভারতীয় সেনার হামলায় পাকিস্তান যখন নাস্তানাবুঁদ, তখন তাদের সাহায্যে এগিয়ে যায় চীন।

 

গত বৃহস্পতিবার চীনের সরকারি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই কথা স্বীকার করে নিয়েছেন অ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন অব চীনের কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার।