সংযুক্ত আরব আমিরাত গত ৪ থেকে ১০ মের মধ্যে দফায় দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। ফুজাইরাহ তেল শোধনাগারসহ দেশটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানা হয়। যদিও ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দায় অস্বীকার করেছে, তবে ঘটনাটি ঘটেছে ঠিক তখনই যখন যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর আওতায় হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে নতুন করে নৌ-অভিযান শুরু করে। ফুজাইরাহতে হামলার পর ৬ মে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অভিযান স্থগিত করলেও আইআরজিসির সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর সংঘর্ষ থেমে থাকেনি। এর জেরে ৭ মে ইরানের কেশম দ্বীপ ও বন্দর আব্বাস বন্দরে বোমাবর্ষণ করে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা জবাবে ইরান বিশেষভাবে আরব আমিরাত ও মার্কিন নৌবহরকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। ৮ মে আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, তারা ইরান থেকে আসা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলা করছে।
এই যুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়েই আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি তেহরানের পরিকল্পনায় স্পষ্ট ছিল। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ১১ মের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগে ৮ এপ্রিল লভান দ্বীপে ইরানের তেল শোধনাগারে নজিরবিহীন (অঘোষিত) হামলা চালিয়েছিল আমিরাত। সামগ্রিকভাবে, চলমান এই সংঘাতের আবহে ইসরায়েল কিংবা জিসিসির (উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ) অন্য দেশগুলোর তুলনায় আমিরাত অনেক বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে।
মূলত ইরানের এই আক্রমণগুলো আমিরাতের ‘কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য’ তৈরির প্রচেষ্টাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সৌদি আরবের ভূ-রাজনৈতিক বলয়ে থাকার পর আমিরাত এখন সেই পথ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। গত ১ মে ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে আমিরাত তাদের এই অবস্থানের জানান দিয়েছে। দীর্ঘ ৫৯ বছর ধরে বিশ্বের বৃহত্তম এই তেল রপ্তানিকারক জোটের দ্বিতীয় প্রভাবশালী সদস্য ছিল তারা।
সৌদির ছায়া
১৯৭১ সালে রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই আমিরাতকে দুটি বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়েছে। একদিকে, নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রভাব বিস্তার করা, অন্যদিকে আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বন্দ্বে না জড়ানো। ১৯৭৪ সালের জেদ্দা চুক্তির মাধ্যমে রিয়াদ শুরুতেই এই সমীকরণটি স্পষ্ট করে দিয়েছিল। সেই সময় কাতারের সঙ্গে আমিরাতের সরাসরি সীমান্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে ‘বুরাইমি করিডোর’ নিজেদের দখলে নেয় সৌদি আরব, যা মেনে নিতে বাধ্য হয় আবুধাবি।
আমিরাতের জন্য এই ছাড় দেওয়াটা ছিল একপ্রকার বাধ্যবাধকতা, যাতে বড় প্রতিবেশী সৌদির সঙ্গে শত্রুতা এড়ানো যায়। ফলে কয়েক দশক ধরে আমিরাতের পররাষ্ট্রনীতি হয় সৌদির অনুগামী ছিল, নয়তো রিয়াদকে আস্থায় নিয়ে পরিচালিত হয়েছে। ২০০৯ সালে মার্কিন কর্মকর্তাদের এক মূল্যায়নে উঠে এসেছিল যে, প্রকাশ্যে সৌদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখালেও একান্ত আলোচনায় আমিরাত রিয়াদকেই ইরানের পর তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম নিরাপত্তা হুমকি মনে করে।
২০১৩-১৪ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় যখন ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল, তখন সৌদি আরব দূরত্ব বজায় রাখলেও আমিরাত তেহরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। এমনকি ২০২৫ সালের শুরুতেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দুই দেশের বাৎসরিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৯ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
তবে আমিরাতের আসল লক্ষ্য ইরানের সঙ্গে আদর্শিক মিত্রতা ছিল না; বরং সৌদির ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় তৈরিতে মন দেয়। এখানেই সৌদির সঙ্গে আমিরাতের পার্থক্য তৈরি হয়। সৌদি আরব যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমমর্যাদার অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে চায়, সেখানে আমিরাত পুরোপুরি ওয়াশিংটনের সামরিক ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে।
এমবিএস ও এমবিজেড রসায়ন
২০১৭ সালের দিকে আমিরাত তার কৌশলে পরিবর্তন আনে। আমিরাতের ডি-ফ্যাক্টো শাসক মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজেড) ও সৌদির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) মধ্যে এক ধরনের ‘গুরু-শিষ্য’ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এমবিএসের আধুনিকায়ন ও কট্টর আদর্শিক চিন্তামুক্ত পররাষ্ট্রনীতি এমবিজেডের চিন্তাধারার সঙ্গে মিলে যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এমবিএসের ক্ষমতা সুসংহত করতে ওয়াশিংটনে জোর লবিং করেছিলেন এমবিজেড।
পরবর্তী বছরগুলোতে এই দুই নেতা একসঙ্গে ইয়েমেন যুদ্ধ শুরু করেন, ইরানের পারমাণবিক চুক্তির বিরোধিতা করেন এবং কাতারের ওপর চার বছরব্যাপী অবরোধ আরোপ করেন। ২০১৮ সালে জিসিসি-কে পাশ কাটিয়ে ‘সৌদি-আমিরাত সমন্বয় কাউন্সিল’ গঠন করেন তারা। তবে ২০১৯ সালে যখন সৌদির তেল স্থাপনায় হুতিরা হামলা চালায়, তখন আমিরাত সৌদির পথ অনুসরণ না করে ইরানের সঙ্গে নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় বসে। এখান থেকেই দুই বন্ধুর পথে ফাটল দৃশ্যমান হতে থাকে।
ইয়েমেন ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস
ইয়েমেনে আমিরাত তাদের সরাসরি সমর্থন কমিয়ে দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এসটিসি) মদদ দিতে শুরু করে। ২০২০ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি ছিল আবুধাবির মাস্টারস্ট্রোক। তারা আশা করেছিল সৌদি আরবও দ্রুত এই পথে হাঁটবে। কিন্তু সৌদি আরব যেহেতু মুসলিম বিশ্বের প্রধান পবিত্র স্থানগুলোর রক্ষক, তাই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়াই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক করা এমবিএসের জন্য কঠিন ছিল। বিশেষ করে ২০২৩ সালে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর সৌদির জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মেলানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সৌদি আরব পিছিয়ে আসায় আমিরাত কার্যত একা হয়ে পড়ে। আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের ফলে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। তেহরান সরাসরি আমিরাতকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে আখ্যা দেয় এবং তাদের ভূখণ্ডকে ইরানের জন্য ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে ঘোষণা করে। ২০২৪ সালে যখন ইরান ও ইসরায়েল সরাসরি একে অপরকে আক্রমণ করে, তখন ইরান হুমকি দেয় যে আমিরাতে ইসরায়েলি উপস্থিতির কারণে তারা প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে।
চূড়ান্ত বিচ্ছেদ
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর আমিরাত এক ভয়াবহ সংকটে পড়ে। দুবাইয়ের পর্যটন খাত মুখ থুবড়ে পড়ে। মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, দুবাইয়ের হোটেলগুলোতে পর্যটকের সংখ্যা যুদ্ধের আগের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।
ইরান কৌশলে সৌদি আরবের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেও আমিরাতকে ক্রমাগত আক্রমণ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে ইয়েমেন, সুদান এবং হর্ন অব আফ্রিকায় সৌদি ও আমিরাতের স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এমনকি পাকিস্তানেও আমিরাতকে সরিয়ে সৌদি আরব প্রধান অর্থনৈতিক সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ইরানের সামরিক হামলা, সৌদির উদাসীনতা ও অর্থনৈতিক ধস এই ত্রিমুখী চাপে পড়ে আবুধাবি এখন ‘স্ট্র্যাটেজিক ব্রেকআউট’ বা কৌশলগত স্বাতন্ত্র্যের পথ বেছে নিয়েছে। মাথাপিছু জিডিপি এবং বৈশ্বিক বন্দর ব্যবস্থাপনায় আমিরাত এখন সৌদির চেয়েও এগিয়ে। ওপেক থেকে বেরিয়ে আসা তাদের সেই স্বাধীন পথের প্রথম পদক্ষেপ। তারা এখন ওপেকের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই তেল উৎপাদন বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার শান্ত রাখতে চায় এবং নিজেদের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে চায়।
আঞ্চলিক জোটগুলো (জিসিসি বা ওআইসি) ইরানের হামলার মুখে আমিরাতকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এমবিজেডের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশের মতে, জিসিসি এখন ইতিহাসের দুর্বলতম পর্যায়ে রয়েছে। দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে নীতিগত পার্থক্য এবং ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণে ইরানের অব্যাহত সামরিক হুমকি— এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে আমিরাত এখন এক অনিশ্চিত কিন্তু স্বাধীন ভবিষ্যতের পথে হাঁটছে।
[এনডিটিভি থেকে অনূদিত]
লেখক: বশির আলী আব্বাস
নয়াদিল্লির কাউন্সিল ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স রিসার্চের একজন সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট