► এক সপ্তাহের মধ্যেই চুক্তি হতে পারে - ডোনাল্ড ট্রাম্প
► প্রাধান্য পাবে ইরানি জনগণের অধিকার - মাসুদ পেজেশকিয়ান
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৪ দফার প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে ইরান। গতকাল দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা আলী খামেনির সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি জানান, ইরানের জনগণের অধিকার রক্ষার বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের সঙ্গে চুক্তি হতে পারে। বুধবার পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের কাছে এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা প্রস্তাব পাঠায় মার্কিন প্রশাসন। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ কর্মসূচি স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। এ ছাড়া উভয় পক্ষই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত সব ধরনের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করতে সম্মত হবে। প্রস্তাবের বিষয়ে জবাব দিতে ইরানকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো প্রস্তাব নিয়ে ইরানের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য রয়েছে। এ নিয়ে গতকাল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। বৈঠকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এ বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সর্বোচ্চ নেতার বিনয় ও গভীর অন্তরঙ্গতা; যা আলোচনায় আস্থা, শান্তি ও সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি করে।’
এর আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে ফোনালাপে মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক পথে হাঁটতে প্রস্তুত ইরান। তবে এ ক্ষেত্রে জনগণের অধিকার রক্ষার বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না।’ ফোনালাপ শেষে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনালাপে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলাকালেই ইরানকে লক্ষ্য করে দুবার হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি পেছন থেকে ছুরি মারার শামিল।’
তবে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইবরাহিম রেজায়ি মার্কিন প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, ‘এটি যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা দাবিদাওয়ার তালিকা ছাড়া আর কিছুই নয়। রণক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যা অর্জন করতে পারেনি, তা আলোচনার টেবিলে আদায়ের অপচেষ্টা করছে। ইরান কোনো চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। প্রয়োজনে পাল্টা আঘাতের জন্য দেশটির সেনারা প্রস্তুত আছেন।’
অন্যদিকে এক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা বা চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে বলে আশা ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফক্স নিউজের সাংবাদিক ব্রেট বায়ার এক লাইভ অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়েছে। প্রস্তাবিত এ সমঝোতা স্মারক নিয়ে তিনি বেশ আশাবাদী। আমি তাঁকে সময়সীমার কথা জিজ্ঞাসা করলে প্রেসিডেন্ট জানান, সব ঠিক থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যেই এটি চূড়ান্ত হতে পারে। তবে ট্রাম্প বিষয়টিকে “সতর্ক আশাবাদ” হিসেবে দেখছেন।’
সৌদির আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় স্থগিত ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ : হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা জাহাজগুলো বের করে নিয়ে আসতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি নতুন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এ ঘোষণার দুই দিন পার না হতেই তিনি এটি স্থগিত করেন। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি জানিয়েছে, এ অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারে অনুমতি দেয়নি সৌদি আরব। এর ফলে ট্রাম্প এটি স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন। দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ট্রাম্পের প্রজেক্ট ফ্রিডম অভিযান ঘোষণার পর সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অন্য আরব দেশগুলো অবাক হয়। এরপর সৌদির ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে এ ব্যাপারে ট্রাম্প কথা বলেন। কিন্তু তাঁরা দুজনে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি।
হরমুজে এখনো আটকা ১৬০০ জাহাজ : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চললেও বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছে এখনো প্রায় ১ হাজার ৬০০ জাহাজ আটকে আছে। মাস দুই-একের বেশি এ জলপথ ছাড়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে গিয়ে জাহাজ চলাচল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ব্যয়বহুল ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ পরিস্থিতিতে পড়েছে। এখন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা ঝুঁকি নিয়ে নিজস্ব উদ্যোগে হরমুজ প্রণালি পার হতে চাচ্ছে না। তাদের মতে আটকে থাকা জাহাজগুলো পানিতে ভাসালে, সেটা পণ্য ও কর্মী উভয়ের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।
ইরানে আবার হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের বার্তা : ইরানে নতুন করে হামলা শুরু করতে যুক্তরাষ্ট্রকে বার্তা পাঠিয়েছেন ইসরায়েলের সামরিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক নীতিনির্ধারকরা। ইসরায়েলি পাবলিক ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (আইপিবিসি) বলছে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা বা সমঝোতাকে শুধু ‘সময়ের অপচয়’ মনে করছে ইসরায়েল। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান উত্তেজনা কাজে লাগিয়ে তারা ইরানের মূল ভূখণ্ডে আবারও সামরিক অভিযান চালাতে আগ্রহী।
জানা গেছে, গত মাসে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা ইরানে হামলার জন্য লক্ষ্যবস্তুর একটি নতুন তালিকা তৈরি করেছেন। এ তালিকায় ইরানের বেশির ভাগ অপরিশোধিত তেল শোধনাগার ও এ-সংক্রান্ত স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।