Image description

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও কিছু সংস্কার নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াত, এনসিপির বিরোধ চলছে। জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট রাজপথের কর্মসূচি পালন করছে। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সব দল একাট্টা। তারা এক সুরেই বলছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যেকোনো ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করা হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দিল্লির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকর গঠন করে বাংলাদেশবিরোধী কিছু করার চেষ্টা করলে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করা হবে। বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির বিজয়ের পর সীমান্তে ‘পুশব্যাক’ ইস্যুতে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। বিজেপি নেতারা বাংলাদেশ ও মুসলমানদের নিয়ে নানান অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছেন। কিন্তু বাংলাদেশের সব মত ও পথের রাজনৈতিক দল হিন্দুত্ববাদী বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। সীমান্তে যেমন নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে; তেমনি বিজেপির বাংলাদেশবিরোধী যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দিতে সবাই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করে বিএনপি নেতা নাজিম উদ্দিন আহমদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বীরের বেশে বিমানে ঢাকায় ফিরবেন বলে মন্তব্য করেছেন। আমরা নাকি তাকে স্যালুট দিয়ে নিয়ে আসব, অভ্যর্থনা জানাব! পাগলের প্রলাপ! ভোট চোর, ভোট ডাকাত, লুটেরা হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনবে? বাংলাদেশি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিদেশি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সবাই সবার কাছে স্বীকৃত একটি সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আমাদের প্রিয় নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। আর শুভেন্দু অধিকারী দাবি করছেন, এখানে বৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসবেন! হাসিনাকে রুখতে ২০ কোটি মানুষ বাংলাদেশে শহীদ হয়ে যাবে। আমরা প্রতিটি মানুষ এ দেশের প্রতিটি ইঞ্চি রক্ষা করার জন্য, জমি রক্ষা করার জন্য শহীদ হয়ে যাব।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির বিজয়ের এ অঞ্চলে রাজনীতিতে নতুন হিসাব শুরু হয়ে গেছে। প্রতিবেশী আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করলে দেশের মুসলিম নিধন এবং বাংলাদেশে সম্পর্কের আরো অবনতি হতে পারে। কারণ মুসলিমবিদ্বেষ কার্ড ব্যবহার করে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি বিজয়ী হয়। বিজেপি অন্য রাজ্যে যে কার্ডই খেলুক নির্বাচনে ভোট পেতে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরায় মুসলিমবিদ্বেষ কার্ড ব্যবহার করে। সামনের লোকসভা নির্বাচনে ভালো ফলাফল করতে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার যে সীমান্তে উত্তেজনা বাড়াতে ‘বাংলাভাষী মুসলমানদের পুশব্যাক’ প্রকল্প হাতে নেবেÑ সেটি পরিষ্কার। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এরই মধ্যে পুশব্যাক কর্মসূচি জোরদারের ঘোষণা দিয়েছেন। হিন্দুত্ববাদী এই আগ্রাসন এবং নিষ্ঠুরতাকে রুখে দিতে সব রাজনৈতিক দল ফের একাট্টা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেমন হিন্দুত্ববাদী ভারতের আগ্রাসী কর্মকা- রুখে দিতে সব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিধানসভা নির্বাচনের বিজেপির বিজয়ের পর বাংলাদেশ স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। গতকালও ডিসি সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘আমরা গতকালকেই পুশব্যাকের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি বাড়াতে বিজিবিকে নির্দেশ দিয়েছি। যাতে সীমান্তে তারা সতর্ক থাকে। আশা করি, পুশব্যাক হবে না। সীমান্তে বিশৃঙ্খলার কোনো সম্ভাবনা দেখি না, যদি হয় যাতে তারা এড্রেস করতে পারে। আমার ধারণাÑ সেরকম কিছু ঘটবে না।’

চানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁঁইয়া বলেন, বিগত সময়ে যারা পশ্চিমবঙ্গের সরকারে ছিলেন, তাদের সঙ্গে খুব সুসম্পর্ক না থাকলেও তারা বাংলাদেশকে নিয়ে বর্তমানে যারা আসছেন, তাদের মতো বাজে মন্তব্য করতেন না। নতুন নির্বাচিত সরকারকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কথা না বলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উগ্রপন্থিরা’ পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসছে, আগামী দিনে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক বা সীমান্ত পরিস্থিতি কী রকম হবে, তা নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা আছে।

হিন্দুত্ববাদী বিজেপির পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করলে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক যে হবে না তা পরিষ্কার। বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারণার মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী ভারতবর্ষকে হিন্দুরাষ্ট্র করার অঙ্গীকার করে বলেছেন, ‘ইসরাইল যেমন গাজাকে শিক্ষা দিয়েছে; ভারতের উচিত সেভাবে বাংলাদেশকে সবক দেয়া।’ শেখ হাসিনা বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর বেশে বিমানে ফিরবেÑ এমন ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দিল্লি থেকে ঢাকায় ফিরে যাবেন। এর আগে তিনি বলেছিলেন ‘বাংলাদেশ যুদ্ধ লাগাতে চাইছে। বিএসএফ অত্যন্ত ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিচ্ছে। দিল্লি বাংলাদেশ দখল করতে চাইলে ভারতের কয়েক দিন তো দূরের কথা, কয়েক মিনিটও লাগবে না। বাংলাদেশ দখল করে নিতে পারে দিল্লি।’ আর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, ‘আমি তো সকালে সবসময়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের যে পরিস্থিতি ইউনূসের সময়ে ছিল, সেটিই যেন তারেক রহমানের সময় থাকে, সম্পর্কের উন্নতি যেন না হয়। নির্বাচনে বিজয়ের পর আসাম থেকে বাংলাভাষী মুসলমানদের রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হবে।’

হিন্দুত্ববাদী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় চার হাজার ৯৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থল সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্যের সাথে বাংলাদেশের আটটি বিভাগের সীমানা নির্ধারণ করেছে। ভারতের একাধিক গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছেÑ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তের নদীতে সাপ-কুমির ছাড়ার কথা ভাবছে ভারত। ভারতের সীমান্তরক্ষী-বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মনোজ বার্নওয়াল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এএফপিকে জানিয়েছেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি বৈঠকে সীমান্তে সরীসৃপ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন কলকাতায় দায়িত্বরত ডেপুটি ইনস্পেক্টর জেনারেল বার্নওয়াল বলেন, আমাদের বলা হয়েছে সীমান্তের অরক্ষিত নদীপথগুলোতে সাপ বা কুমির জাতীয় সরীসৃপ ছাড়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে। পরিকল্পনাটি মূলত বন্যাপ্রবণ এলাকার কাঁটাতারহীন সীমানার জন্য। সীমান্তের যেসব জায়গায় অন্যান্য সীমান্তের মতো কাঁটাতারের বেড়া দেয়া সম্ভব নয় কিংবা দিলেও কার্যকর হবে না, সেখানে কুমির ও সাপের মতো প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক ব্যবহারের কথা চিন্তা করা হচ্ছে।’

সীমান্তের নদী-বনে কুমির আর সাপ ছেড়ে দেয়ার চিন্তা উজবুকি চিন্তার নামান্তর। বিএসএফ সীমান্তে ভারতীয়দের দেখলে গুলি করে না; কিন্তু বাংলাদেশিদের হত্যা করে। কিন্তু সাপ ও কুমির মানুষকে কামড়ানোর সময় বাংলাদেশের মানুষ না ভারতের মানুষ বুঝেশুনে কামড়াবে না। যাকে পাবে তাকেই কামড়াবে।
বিএনপির স্থানীয় কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, ভারতে কোন দল ক্ষমতায় এলো তা দেখার বিষয় নয়। ভারতের জনগণ তাদের পছন্দে ভোট দিয়ে নেতা নির্বাচিত করেছে। তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে নিজ দেশের জনস্বার্থকেই গুরুত্ব দেয়া আমাদের লক্ষ্য। বাঙালিদের পুশইন নিয়ে এখনই সংশয় প্রকাশ করার সুযোগ নেই।

জামায়াত নেতা ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেছেন, প্রতিবেশী দেশের নির্বাচন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এতে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বা রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করছে এবং ভবিষ্যতেও এই সম্প্রীতি বজায় থাকবে। কোনো বহিরাগত প্রভাব দেশের অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতিকে নষ্ট করতে পারবে না।