লাল থেকে সবুজ, আর এখন গেরুয়া—যেন রীতিমত রঙ বিপ্লব। যুগান্তকারী যে পরিবর্তন পশ্চিমবঙ্গে ঘটে গেল, তার ব্যাখ্যা কী?
৩৪ বছরের কমিউনিস্ট শাসনের পতন ঘটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১ সালে নিজেদের ‘বামপন্থিদের চেয়েও বেশি বামপন্থি’ হিসেবে তুলে ধরেছিল, তারা কীভাবে এত সহজে বিজেপির কাছে পরাস্ত হল, তা নিয়ে ভারতের রাজনীতি বিশ্লেষকরা নানা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।
সাবেক আমলা ও রাজ্যসভার সদস্য জওহর সরকার এর জন্য দায়ী করেছেন এপ্রিলের শেষের দিকে দুই দফায় অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের ঠিক আগে প্রায় ৯০ লাখ ভোটারকে তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার ঘটনাকে, যা তার ভাষায় ‘নির্বাচনি গণহত্যা’।
ওই ৯০ লাখ ভোটারের মধ্যে অনেকে মারা গেছেন বা পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন; আবার কিছু ভোটার হয়ত সত্যিই বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী। কিন্তু ওই সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ছিলেন প্রকৃত ভোটার, বিশেষ করে প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষ, যারা ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন।
নির্বাচন বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব ও প্রণয় রায় একে বলেছেন ‘চুরি হওয়া নির্বাচন’ এবং ভারতের সাংবিধানিক গণতন্ত্রের ওপর ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’। তাদের মতে, অধিকাংশ বিধানসভা আসনে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়ার বিষয়টি তৃণমূলের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়েছে। তৃণমূল নেতারাও এর সঙ্গে একমত।
অন্যদিকে বিজেপি নেতাদের দাবি, ১৫ বছরের ‘চরম দুঃশাসন’ই শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতন ডেকে এনেছে। আর পশ্চিমবঙ্গের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তাদের যুক্তি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতির মত বিষয়গুলোর কারণে স্বাভাবিক সরকারবিরোধিতার প্রভাব নিশ্চিতভাবেই দৃশ্যমান ছিল।
বিজেপির রাজ্যসভা সদস্য স্বপন দাশগুপ্ত দাবি করেছেন, বাঙালিরা যে মূল্যবোধগুলোকে লালন করে, সেগুলো ‘ধ্বংস করার অপচেষ্টায়’ তারা তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছিল এবং এটাই তৃণমূলবিরোধী জোয়ারের কারণ।
বিজেপি যে এবার নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, তার সঠিক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন নির্বাচন বিশ্লেষক অমিতাভ তিওয়ারি। তার মতে, মমতার ‘অতিরিক্ত মুসলিম তোষণ’ বিজেপির হিন্দু ভোট একজোট করার রাজনীতিকে সহায়তা করেছে।
তিওয়ারি এবং দাশগুপ্ত সমগ্র পশ্চিমবঙ্গজুড়ে বাঙালি ও অবাঙালি হিন্দুদের মধ্যে এক ধরনের ‘অস্তিত্ব সংকটের অনুভূতি’ তৈরি হওয়ার কথা বলেছেন, যা বিপুল ভোটার উপস্থিতি এবং মমতার বিরুদ্ধে এমন আক্রোশ নিয়ে হিন্দুদের ভোট দেওয়ার অন্যতম কারণ, যা ২০১১ সালের পর আর দেখা যায়নি।
আমি বলব, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এখানে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে এবং বিজেপিকে এমন এক হিন্দু সংহতি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে, যা শেষ পর্যন্ত মমতার পরাজয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ ব্যবহার করে ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতি’ করার অভিযোগ তুলেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। সীমান্ত সুরক্ষিত করতে এবং অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তারা বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বিজেপির অন্যতম মুখ্য প্রচারক ও আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা পশ্চিমবঙ্গে সভা করে ‘অনুপ্রবেশকারীদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলে’ তাদের পুশব্যাক করার প্রতিশ্রুতি দেন। বিজেপির আরও আগ্রাসী প্রচারকরা এমন কথাও বলেন যে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময় শেষ এবং তিনি এখন চাইলে ‘পশ্চিম বাংলাদেশের মন্ত্রী’ হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। তৃণমূলের কথিত মুসলিম তোষণ নীতিকে বড় করে দেখানোর লক্ষ্যে এই প্রচারকরা তাকে উপহাস করে ‘মমতাজ বেগম’ বলেও সম্বোধন করেছেন।
তৃণমূলের জবাবও ছিল প্রত্যাশিত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসব অভিযোগকে ‘হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’ বলে উড়িয়ে দেন; তিনি বলেন, “বাংলায় এসবের কোনো জায়গা নেই।” অন্যদিকে, তার ভাইপো ও দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে মনে করিয়ে দেন যে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনেই কাজ করে। জবাবে পশ্চিমবঙ্গে সীমান্ত ফাঁড়ি স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণের সমস্যার কথা তুলে ধরে অমিত শাহ পাল্টা আক্রমণ করেন এবং এর দায় রাজ্য সরকারের ওপর চাপিয়ে দেন। তৃণমূল কংগ্রেসের অন্য নেতারা ধর্ম ও জাতপাতের বাধা পেরিয়ে বাঙালি পরিচয়ের ওপরই সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন।
হিমন্ত বিশ্বশর্মা জোরালোভাবে দাবি করেন, তার দল ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ভোটে’ একেবারেই আগ্রহী নয়। আসামে তিনি বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিমদের ‘মিয়া’ বলে গালমন্দও করেছিলেন। শর্মা বারবার জোর দিয়ে বলেন যে, হিন্দু ভোট একজোট করার নীতি যদি আসামে কাজ করে থাকে এবং বিজেপিকে পর পর দুটি নির্বাচনে ক্ষমতায় এনে থাকে, তাহলে এবার আসাম ও বাংলা দুই জায়গাতেই তা কাজ করবে। আর সম্ভবত তার প্রত্যাশা অনুযায়ী সেটা কাজও করেছে।
বাংলার মোট ভোটারের ২৭ শতাংশ এবং আসামের ৩৪ শতাংশ মুসলমান। তৃণমূল কেবল তখনই ক্ষমতা ধরে রাখতে পারত, যদি মুসলমানরা পুরোপুরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন দিতেন এবং তিনি মোট হিন্দু ভোটের অন্তত অর্ধেক নিজের পক্ষে রাখতে পারতেন, যা এতকাল মূলত নারী ও গ্রামীণ দরিদ্রদের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
প্রথমে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে এবং পরে একজন সাংবাদিক হিসেবে সেই ১৯৭৮ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। সে সময় বিপুল ভোটে ক্ষমতায় আসা বামফ্রন্টের টানা ৩৪ বছরের রাজ্য শাসনের সূচনা হয়েছিল। এরপর এসেছে তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনকাল।
সিপিএম-নিয়ন্ত্রিত বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেস জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের উপস্থিতির দাবি করলেও মূলত আঞ্চলিক পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি করে গেছে। তারা ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বাঙালি পরিচয়ের ওপর জোর দিয়েছে এবং সে কারণেই ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির প্রতি তাদের এক ধরনের অনাগ্রহ ছিল।
বর্ষীয়ান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত বলেন, “এই নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া পরিবেশ আমাকে দেশভাগের সময়ের সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে আর কোনো নির্বাচনে ধর্মীয় আবেগ এতটা প্রভাব বিস্তার করেনি।”
বাংলাদেশ নিয়ে একটি বইয়ের রচয়িতা দাশগুপ্ত বলেন, “বাংলাদেশ বিজেপির আক্রমণের সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে, কারণ গেরুয়া শিবির আমাদের প্রতিবেশী দেশে ক্রমবর্ধমান ইসলামী উগ্রবাদের উত্থান নিয়ে হিন্দুদের ভীতিকে কাজে লাগাতে চায়।”
হাসিনার পতনের প্রভাব
বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদী শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশটিতে কট্টর ইসলামি শক্তির অভূতপূর্ব উত্থান পশ্চিমবঙ্গের জনমানসে এক গভীর প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ থেকে হিন্দু ও অমুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন, বিশেষ করে ধর্ষণ এবং সুফি মাজারগুলোতে ক্রমবর্ধমান হামলার খবর আসতে থাকায়, এবং ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে বিপুল সংখ্যক উদারপন্থি ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে বিজেপির ‘অনুপ্রবেশ-বিরোধী’ প্রচার জোরদার হতে শুরু করে, যা সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে আরও প্রসার লাভ করে। বাংলাদেশে ইসকন সন্ন্যাসী চিন্ময় প্রভুকে গ্রেপ্তার ও আটকে রাখার প্রতিবাদে কলকাতায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনের সামনেও বিক্ষোভ হয়।
ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায়, পাকিস্তানপন্থি জামায়াতে ইসলামী, যারা হাসিনার পতনের কয়েকদিন আগে নিষিদ্ধ হয়েছিল, তারা হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের যুব নেতাদের নতুন দল এনসিপির সাথে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোটবদ্ধ হয়, যাদের নেতারা বাংলাদেশে একটি ইসলামিক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়। আর তাতে সংখ্যালঘুদের প্রান্তিকীকরণের আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে।
সীমান্তে জামায়াতের উত্থান
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী অভূতপূর্ব সাফল্য পায়। ইউনূস সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করায় বিএনপি ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে ২১৩টি আসন জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।
স্বাধীন বাংলাদেশে এর আগে কখনও ১৮টির বেশি আসন না পাওয়া জামায়াতে ইসলামী এবার ৬৮টি আসনে জয়লাভ করে। তাদের মিত্ররা, যার মধ্যে এনসিপিও রয়েছে, আরও ৯টি আসনে জয় পায়। যেহেতু ১৯৯০ এর দশক থেকেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ ছিল, তাই বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রায়ই নোবেলজয়ী ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি, বিএনপির তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী এবং জামায়াত প্রধান শফিকুর রহমানকে উপ-প্রধানমন্ত্রী করে একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনার কথা শোনা যেত। নারীদের ওপর তালেবানি ধাঁচের মোরাল পুলিশিং এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যুক্ত উদারপন্থী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলার বিরুদ্ধে বিএনপির দিক থেকে প্রশাসনিক প্রতিরোধের অভাব, ইউনূস সরকারের আমলে শুরু হওয়া ইসলামি কট্টরপন্থার দিকে এক বিপজ্জনক ঝোঁকের আশঙ্কা জাগিয়ে তোলে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর পাওয়া ৬৮টি আসনের মধ্যে ৫১টিই ভারতের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে অবস্থিত। এর মধ্যে কয়েকটি ছাড়া প্রায় সবকটিই পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে, বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা যেমন রংপুর, রাজশাহী, গাইবান্ধা এবং সাতক্ষীরায়।
সীমান্তে বিজেপির সাফল্য
পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪ আসনের বিধানসভার ৪৪টির মত আসন বাংলাদেশ সীমান্তের লাগোয়া। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, দার্জিলিং, মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর ২৪ পরগনা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই আসনগুলোতে প্রায়ই বাংলাদেশের নির্বাচনি ফলাফলের প্রভাব পড়ে। কারণ এই ৪৪টির পাশাপাশি আরও প্রায় ৫০টি আসন বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে খুব একটা দূরে নয় এবং উত্তপ্ত সীমান্তের ওপারে ঘটা যে কোনো ঘটনায় এসব এলাকার সরাসরি প্রভাবিত হওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস এই ৪৪টি আসনের মধ্যে ২৭টিতে জয়ী হয়েছিল, বিশেষ করে সেগুলোতে যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে। তবে বিজেপি ওই ৪৪টি আসনের মধ্যে ১৭টি জিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে পেরেছিল মূলত বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসী মতুয়া হিন্দুদের শক্তিশালী উপস্থিতির কারণে। প্রায় ৪০টি আসনে মতুয়া ভোটারের সংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজেপি এই একশর মত আসনে বড় জয় পায়, আর সেটাই রাজ্যে বিজেপির বিপুল বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে মুর্শিদাবাদ জেলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘মুসলিম তোষণ’ এবং ‘অনুপ্রবেশের প্রতি নমনীয়তা’র অভিযোগ তুলে আক্রমণ জোরদার করে বিজেপি। এরপর সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জামায়াতের সাফল্য ওই প্রচারকে আরও শক্তিশালী করে তোলে, যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি নির্বাচনি সুবিধা আদায় করে নিতে সক্ষম হয়।
এমনকি মালদা ও মুর্শিদাবাদের মত মুসলিম-অধ্যুষিত জেলায়, যেখানে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ছিল, সেখানেও এই বাংলাদেশ ফ্যাক্টরের কারণে অভূতপূর্বভাবে হিন্দু ভোট একজোট হয় এবং বেশ কিছু অঘটন ঘটে।
জ্যোতি বসুর ভবিষ্যদ্বাণী
‘দুই বাংলার’ এই সাম্প্রদায়িক প্রভাব সবচেয়ে ভালো বুঝেছিলেন প্রয়াত জ্যোতি বসু। পূর্ববঙ্গে শেকড় থাকায় তার মধ্যে নিশ্চিতভাবেই এক ধরনের নস্টালজিয়া ছিল, তবে বাংলাদেশের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ই ছিল অত্যন্ত বাস্তববাদী।
১৯৯৬ সালে যখন তিনি গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরে নেতৃত্ব দেন এবং ঠিক তার এক বছর পর বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী বিদ্রোহের অবসানে ভারতের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি কেন বাংলাদেশের তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারকে সাহায্য করতে এত বেশি আগ্রহী ছিলেন।
হাত নেড়ে স্বভাবসুলভ ইংগিতময় ভাষায় বসু বলেছিলেন: “ওখানে ওরা এসে গেলে, এখানে এদের আটকানো মুশকিল হবে।” যার মানে হল, হাসিনা যদি ক্ষমতাচ্যুত হন, তবে ইসলামপন্থিরা বাংলাদেশের দখল নেবে এবং এখানে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে আটকে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তিনি কারও নাম নেননি; প্রথমে চিবুকের দিকে (দাড়ি বোঝাতে) ইংগিত করে বলেছিলেন ‘ওরা’, তারপর কপালের দিকে (তিলকের জায়গা) ইশারা করে বলেছিলেন ‘এদের’।
জ্যোতি বসু যে বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতেন, মনে হচ্ছে এখন সেটাই সত্য হতে চলেছে।
[সুবীর ভৌমিক পূর্ব ভারতে বিবিসি ও রয়টার্সের সাবেক প্রতিনিধি। তিনি উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশ নিয়ে একাধিক বই লিখেছেন। দীর্ঘকাল বিবিসিতে কাজ করার পর তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সিনিয়র এডিটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন, পাশাপাশি কাজ করেছেন মিয়ানমারের মিজিমা মিডিয়াতে। তিনি অক্সফোর্ডের একজন প্রাক্তন ফেলো।]