২৮শে ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর ইরানে ব্যাপক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। তাতেও পারমাণবিক বোমা বানানোর সক্ষমতা একটুও কমেনি ইরানের। তাদের ৬০ ভাগ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কোন হদিস পায়নি যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন গোয়েন্দারা ধারণা করছে, এই ইউরেনিয়াম দিয়ে ইরান স্বল্প সময়ের মধ্যেই পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলতে সক্ষম হবে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্রকে উদ্ধৃত করে এই তথ্য প্রকাশ করেছে বার্র্তা সংস্থা রয়টার্স। গত বছর জুনে ‘অপারেশন মিড হ্যামারে’র পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ধারণা করেছিলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা কমপক্ষে এক বছর পিছিয়ে গেছে। তবে সাম্প্রতিক দুই মাসের যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান সেই সময়সীমায় বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি বলে প্রতিবেদন দিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দারা।
ফের যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের লাভ-ক্ষতি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া নতুন দফার সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মূলত ইরানের সামরিক অবকাঠামোকে টার্গেট করেছে। এছাড়াও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সহ প্রায় ৫০ জন শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিকে হত্যা করে তারা। পাশাপাশি ইরানের বেশ কিছু পারামাণবিক বিজ্ঞানীকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরাইল ইরানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে। তবুও সামগ্রিকভাবে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ অক্ষত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হামলা চালানোর যে প্রধান উদ্দেশ্য ইরানের ‘রেজিম পরিবর্তন’ তা ব্যর্থ হয়েছে।
গত ৭ এপ্রিল উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে উত্তেজনা এখনো তীব্র। ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ ভাগ তেল সরবরাহ হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ এবং বৈশ্বিক চাপের মুখে পড়েছে। মার্কিন আইনসভা কংগ্রেসের কঠোর জেরার মুখে পরতে হয়েছে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে।
ডেমোক্রেট সিনেটর অ্যাডাম স্মিথ বলেন, ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম যে অবস্থায় ছিলো তেমনই আছে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়েছে। সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ বৃদ্ধি পেয়েছে। জনপ্রিয়তা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে ট্রাম্প প্রশাসনের। পেন্টাগন প্রধান হেগসেথ কংগ্রেসে জানিয়েছে ইরান যুদ্ধে এখন অব্দি ব্যয় হয়েছে ২৫০০ কোটি ডলার। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যেমনটা আশা করেছিলো তেমন লাভ করতে সক্ষম হয়নি। এখন তারা যুদ্ধ থেকে মুখ রক্ষা করে বের হবার উপায় খুঁজছে।
পারমাণবিক সক্ষমতা: কী বলছে গোয়েন্দারা
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ইরান চাইলে ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন করতে সক্ষম। জুন মাসে নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনা, ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনা এবং ইসফাহান নিউক্লিয়ার গবেষণা কেন্দ্রে হামলার পর এই সময়সীমা ৯ মাস থেকে এক বছর হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, তারা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ ভাগ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান সম্পর্কে।
ধারণা করা হচ্ছে, এর একটি বড় অংশ ইসফাহানের ভূগর্ভস্থ টানেলে সংরক্ষিত। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এই মজুদ সম্পূর্ণরূপে সমৃদ্ধ করা হলে প্রায় ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব।
মার্কিন অবস্থান ও কৌশল
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। একই অবস্থান ব্যক্ত করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলাগুলো পারমাণবিক স্থাপনার চেয়ে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা শিল্পকে বেশি লক্ষ্যবস্তু করেছে। ফলে পারমাণবিক কর্মসূচিতে প্রত্যক্ষ প্রভাব সীমিত হয়েছে।
সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষক এরিক ব্রুয়ার বলেন, ইরানের কাছে এখনো তাদের পারমাণবিক উপাদান রয়েছে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এগুলো সম্ভবত এমন ভূগর্ভস্থ স্থানে রাখা, যেখানে প্রচলিত বোমা দিয়ে ধ্বংস করা কঠিন। অন্যদিকে, ইসরাইলের অভিযানে ইরানের শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। জাতিসংঘ সাবেক পরমাণু কার্যক্রম পরিদর্শক ডেভিড অলব্রাইট বলেন, জ্ঞান ধ্বংস করা না গেলেও দক্ষতা বা কার্যকর প্রয়োগের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা এখন এমন কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প বিবেচনা করছেন। ইসফাহানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনা থেকে ইউরেনিয়াম সরাসরি উদ্ধার করতে স্থল অভিযান চালাতে চায় তারা। তবে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের মতে, তেহরান ২০০৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচি বন্ধ করলেও কিছু গোপন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।