Image description

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক পালাবদল ঘটেছে। টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। একসময় বামফ্রন্টকে হটাতে বিজেপির সহযোগিতা নেওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যই আজ সেই বিজেপিই মমতার দূর্গের পতন ঘটাল।

২৯৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি জয় পেয়েছে ২০৭টিতে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস থেমে গেছে ৮০ আসনে। ভোটের হিসাবেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে-তৃণমূলের ভোট কমে ৪০.৮০ শতাংশে নেমে এসেছে, আর বিজেপির ভোট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫.৮৪ শতাংশে। বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের হারানো ভোটের বড় অংশ বিজেপির দিকে চলে যাওয়াই এই বিপুল জয়ের মূল কারণ।

হেভিওয়েট নেতাদের পরাজয়ও তৃণমূলের বড় ধাক্কা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই পরাজিত হয়েছেন, পাশাপাশি দলের একাধিক শীর্ষ নেতা নিজ নিজ আসনে হার মেনেছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী নিজের রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও রাজনৈতিক কারণ কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। গত এক দশকে দলটি বুথ স্তর পর্যন্ত শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত গড়ে তোলে, যা তাদের নির্বাচনী যন্ত্রকে অত্যন্ত কার্যকর করে তোলে। তৃণমূল কংগ্রেস ও বাম শিবির থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মী ও নেতার যোগদান বিজেপিকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও দৃঢ় অবস্থান এনে দেয়। একই সময়ে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের ক্রমাগত দুর্বলতা রাজ্যে একটি বড় বিরোধী শূন্যতার সৃষ্টি করে, যার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিজেপি দ্রুত প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

রাজনৈতিক বয়ানের দিক থেকেও বিজেপি কৌশলী ভূমিকা নেয়। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে কেন্দ্রীয় উন্নয়ন প্রকল্পের প্রচার এবং ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’-এর প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে তুলে ধরে তারা ভোটারদের একাংশকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। পাশাপাশি আঞ্চলিক কৌশল প্রয়োগ করে উত্তরবঙ্গে প্রথমে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলা হয়, যেখানে তৃণমূলবিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগানো হয়। পরবর্তীতে দক্ষিণবঙ্গেও ধর্মীয় মেরুকরণ ও উন্নয়নের বার্তা ছড়িয়ে দলটি নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই উত্থান হঠাৎ করে ঘটেনি; বরং এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত রাজনৈতিক অগ্রযাত্রার ফল। ১৯৮০-এর দশকে প্রান্তিক শক্তি হিসেবে যাত্রা শুরু করা দলটি ১৯৯০-এর দশকে তৃণমূলের সঙ্গে জোটের মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রভাব বাড়ায়। ২০১৪ ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বড় সাফল্য তাদের সংগঠনিক শক্তিকে আরও দৃঢ় করে। এরপর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৭৭টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয় বিজেপি। অবশেষে ২০২৬ সালে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থানের ধারাবাহিকতা পূর্ণতা পায়, যা প্রমাণ করে সুপরিকল্পিত কৌশল ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই দলটি এই অবস্থানে পৌঁছেছে।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিষ্ঠিত জনসংঘ থেকে উদ্ভূত বিজেপি মূলত হিন্দুত্ববাদী আদর্শে বিশ্বাসী। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলটি ধর্মীয় মেরুকরণকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে।

সমালোচকদের মতে, বিজেপির এই উত্থানের পেছনে ‘হিন্দু কনসোলিডেশন’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে দলটির দাবি-তারা উন্নয়ন ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করে।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের একটি বড় কারণ হলো বাম ভোটের স্থানান্তর। বাম সংগঠনের কর্মী-ভিত্তিক কাঠামোর সঙ্গে বিজেপির সাংগঠনিক মিল থাকায় অনেক বামকর্মী সহজেই বিজেপিতে যুক্ত হয়েছেন।

গ্রামীণ পর্যায়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রভাব এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা-সব মিলিয়ে এই ভোট স্থানান্তর ত্বরান্বিত হয়েছে।

একসময় বিজেপির সঙ্গে রাজনৈতিক সখ্যতা ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ১৯৯৯ সালে এনডিএ সরকারের সময় তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ছিলেন। ২০১১ সালে বামফ্রন্টকে পরাজিত করতেও বিজেপির পরোক্ষ সমর্থন ছিল বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই সম্পর্ক বদলে গিয়ে এখন সরাসরি রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়।

পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনী ফলাফল শুধু একটি সরকার পরিবর্তন নয়, বরং রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পুনর্গঠন। প্রান্তিক শক্তি থেকে ক্ষমতায় আসা বিজেপির এই যাত্রা যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি তৃণমূলের পতনও ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

এখন দেখার বিষয়, ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’-এর প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপ পায় এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে পশ্চিমবঙ্গ কোন পথে এগোয়।

শীর্ষনিউজ