পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দফার ভোট শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থার করা বুথ ফেরত জরিপের ফল প্রকাশিত হয়েছে। কোনো জরিপে তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে, কোনো জরিপে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জাদুসংখ্যা ছুঁয়ে ফেলেছে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪ আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন।
২০২১ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন। অবশ্য জরিপ যে, সব সময় মিলে যায় তা নয়। আবার অনেক সময় মিলে যাওয়ার মতো উদাহরণও রয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকাশিত জরিপে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্গ ভেদ করতে পারে বিজেপি। শুধুমাত্র দু’টি জরিপ সংস্থা ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তৃণমূল কংগ্রেস টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় ফিরবে।
যেখানে চারটি জরিপে বিজেপিকে ১৪৬ থেকে ১৭৫টির মধ্যে আসন দিয়েছে। ম্যাট্রিজের বুথ ফেরত জরিপে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে ১৪৬ থেকে ১৬১টি আসন পেতে চলেছে বিজেপি। তৃণমূল কংগ্রেস পাচ্ছে ১২৫ থেকে ১৪০টি আসন। অন্যরা ৬ থেকে ১০টি আসন পেতে পারে। চাণক্য স্ট্র?্যাটেজি পশ্চিমবঙ্গের জরিপের যে ফল প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়েছে, বিজেপি ১৫০টির বেশি আসন পাবে। ১৫০ থেকে ১৬০টি আসন পেতে পারে তারা।
তৃণমূল কংগ্রেস পাবে ১৩০ থেকে ১৪০টি আসন। অন্যদের এই জরিপেও ৬ থেকে ১০টি আসন দেয়া হয়েছে। পিপল্স পাল্স-এর জরিপে তৃণমূল কংগ্রেসকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ১৭৮ থেকে ১৮৯টি আসন। বিজেপি পেতে পারে ৯৫ থেকে ১১০টি আসন। অন্যদের মধ্যে কংগ্রেস ১ থেকে ৩টি আসন এবং বামেরা শূন্য থেকে একটি আসনে জয় পেতে পারে বলে এই জরিপে দাবি করা হয়েছে।
পি মার্কের জরিপে বলা হয়েছে. বিজেপি পাচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭৫টি আসন। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ১১৮ থেকে ১৩৮টি আসন। জনমত পোলস-এর জরিপ অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেস টানা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। সংস্থাটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দলের জন্য ১৯৫ থেকে ২০৫টি এবং বিজেপি’র জন্য ৮০-৯০টি আসনের পূর্বাভাস দিয়েছে, যা ২০২১ সালের নির্বাচনে উভয় দলের পাওয়া আসনের সংখ্যার খুব কাছাকাছি। প্রজা পোলস-এর জরিপে বলা হয়েছে, বিজেপি ১৭৮ থেকে ২০৮টি আসন পাবে। তৃণমূল কংগ্রেসের আসন সংখ্যা হবে ৬৫ থেকে ১১০।
রেকর্ড ভোট, মমতা অসন্তুষ্ট, মোদি খুশি
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভোটদানের হারে নতুন নজির তৈরি হয়েছে এবার। বুধবার দ্বিতীয় দফার ভোটে ১৪২টি আসনে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোটদানের হার ছিল ৮৯.৯৯ শতাংশ। বিকাল ৫টা পর্যন্ত রাজ্যে প্রথম দফায় পড়েছিল ৮৯.৯৩ শতাংশ ভোট। সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে পূর্ব বর্ধমানে। সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে কলকাতা দক্ষিণে।
বুধবার সকাল থেকে মানুষ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে উৎসাহের সঙ্গে ভোট দিয়েছেন। নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল সমানে সমানে। বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে ইভিএমে ত্রুটি থাকায় ভোট দেরিতে শুরু হয়। প্রথম দফার মতো দ্বিতীয় দফাতেও মোটের উপর নির্বিঘ্নেই ভোট হয়। এই দফার ১৪২টি আসনের কোথাও কোনো বড় রকমের অশান্তির খবর মেলেনি। বিক্ষিপ্ত যে সব অশান্তি, গোলমাল হয়েছে তা কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশের চেষ্টায় কিছুক্ষণের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিকও হয়েছে। সৌজন্যেরও অনেক ছবি ধরা পড়েছে। বুধবার দ্বিতীয় দফায় ভোট হয়েছে দক্ষিণবঙ্গের সাতটি জেলা, পূর্ব বর্ধমান, হাওড়া, হুগলি, কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং নদিয়ায়। এই ৭টি জেলার মধ্যে গত নির্বাচনে চারটিতেই বিজেপি’র আসন ছিল শূন্য। গত ২৩শে এপ্রিল ভোট হয়েছিল ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে। ভোট গণনা ৪ঠা মে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণের দিনটিকে গণতন্ত্রের উৎসবের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন বলে ব্যাখ্যা করেন। বুধবারের ভোটপর্ব নিয়ে মোদি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার মতোই বহু সংখ্যক জনতা ভোটদানের জন্য বাড়ি থেকে বেরোচ্ছেন। লম্বা লম্বা লাইনের ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। গত ছয়-সাত দশকে যা হয়নি, যা কল্পনাও করা যেত না- এবার সেটাই হচ্ছে। ভয়মুক্ত বাতাবরণে পশ্চিমবঙ্গে ভোট হচ্ছে। সাধারণ মানুষ ভয়মুক্ত হয়ে ভোট দিচ্ছেন।
তবে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সকাল থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনীর অত্যাচার নিয়ে সরব হয়েছেন। পুলিশ পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এদিন দুপুরে নিজের ভোট দিয়ে বেরিয়ে এসে মমতা বলেন, অবাধ ভোটের নামে দিনভর অত্যাচার চলেছে। তার অভিযোগ, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় তৃণমূলের এজেন্টদের বার করে দেয়া হয়েছে। মারধর করা হয়েছে মহিলা এবং শিশুদের। নির্বাচন কমিশনের নাম না-করে মমতা বলেন, এটা কি অবাধ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন? তার কথায়, জীবনে এমন দেখিনি। তা সত্ত্বেও বলছি তৃণমূলই জিতবে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতবো। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন সকাল থেকেই তার ভবানীপুর কেন্দ্রের বুথে বুথে টহল দিয়েছেন। ভবানীপুর কেন্দ্রে হাজির ছিলেন বিজেপি’র প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীও।
তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী নির্বাচন কমিশনের পুলিশ পর্যবেক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছেন, এরা তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীদের টার্গেট করে আক্রমণ চালাচ্ছে। তিনি জানান, সারারাত আমি জেগে থেকে সব খবর নিয়েছি। তিনি কেন্দ্রীয় বাহিনীর ‘অতিসক্রিয়তা’ নিয়ে বারবার অভিযোগ তোলেন। পুলিশ পর্যবেক্ষকদের নিয়ে মমতা অভিযোগ করেন, বাইরে থেকে এদের আনা হয়েছে। কোনো কাজ করছে না শুধুমাত্র ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছে, সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে। বিজেপি’র তালে নাচছেন পুলিশ পর্যবেক্ষকরা। তবে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, এসব হতাশার বহিঃপ্রকাশ। নির্বাচন কমিশন বাংলার ভোটের পরিবেশ বদলে দিয়েছে। সকাল থেকে একাধিক বুথে ঘুরলাম। ভোটারদের মধ্যে প্রচণ্ড উৎসাহ দেখছি। সকলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিচ্ছেন।
শেষ দফার এই নির্বাচনে প্রথম কয়েকটি বুথে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়েছে বিজেপি। ইভিএমে বিজেপি প্রতীকের উপর টেপ সাঁটিয়ে দেয়া বা কালি লেপে দেয়ার অভিযোগ করেছেন প্রার্থীরা। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে পুনঃনির্বাচন হবে।
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্বের ভোটগ্রহণ চলাকালে বুধবার ভোরে চাপড়া, শান্তিপুর ও ভাঙ্গড় সহ একাধিক স্থানে সহিংসতা ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, এন্টালি আসনের বিজেপি প্রার্থী প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালের প্রতিনিধিকে একটি ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার পর তিনি ভোটকর্মী ও নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তীতে বিজেপি’র প্রার্থী বিকাশ সর্দার যখন বুথ পরিদর্শনে যান তখন তার ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ। ভেঙে দেয়া হয় বিকাশের গাড়ি। তার নিরাপত্তা রক্ষীর আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়।
নদিয়া জেলার চাপড়ায় একই ধরনের আরেকটি ঘটনায়, তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত লোকজন আরেকজন বিজেপি এজেন্টকে মারধর করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।