ইরানের সরকার ‘মারাত্মকভাবে বিভক্ত’ হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একটি ‘একীভূত’ প্রস্তাব নিয়ে আসার সুযোগ দিতে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সময় তিনি ইরান সরকারকে এভাবেই বর্ণনা করেন।
হোয়াইট হাউসের দাবি, পাকিস্তানে নির্ধারিত দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সামনে ইরানের প্রতিনিধি না আসাই প্রমাণ করে, দেশটির নেতৃত্ব কতটা অসংলগ্ন হয়ে পড়েছে।
তবে ইরানি পর্যবেক্ষকদের মত ভিন্ন। ইরান শুরু থেকে জোর দিয়ে বলছে, আলোচনা শুরু করার আগে তাদের বন্দরগুলোর ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরানের নেতৃত্ব প্রকৃতপক্ষে ট্রাম্পের বর্ণনার চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ।
যুদ্ধের আগের তুলনায় ইরানের বিভিন্ন পক্ষ এখন অনেক বেশি একসারিতে রয়েছে। কারণ, এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিধি বা সার্কেল অনেক ছোট। আয়াতুল্লাহ খামেনির সময়কার বিধিনিষেধের তুলনায় এখন ছোট দলটি যুদ্ধকৌশলের বিষয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ
কাতার জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারবিষয়ক অধ্যাপক মেহরাত কামরাভা সিএনএনকে বলেন, ‘আমি মনে করি, ইরানের নেতৃত্বকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এ যুদ্ধ পরিচালনা ও আলোচনার ধরনেই স্পষ্ট যে তারা যথেষ্ট ঐক্যবদ্ধ।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের বড় অংশকে সরিয়ে দিয়েছে, তখন থেকে দেশটির শাসনব্যবস্থা অনেক বেশি জটিল হয়ে পড়েছে। এখন একসময়ের প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তারা অস্তিত্ব রক্ষার এ যুদ্ধে রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছেন। বিশেষ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা মোজতবা খামেনির (যিনি তাঁর বাবার উত্তরসূরি হয়েছেন) অনুপস্থিতিতে (সশরীর উপস্থিতির বিপরীতে) এই কর্মকর্তাদের গুরুত্ব বেড়েছে।
এই কর্মকর্তাদের এখন একটি কঠিন ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। একদিকে রয়েছে ট্রাম্পের ‘বিজয় ঘোষণা’ করার চাপ, অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরে থাকা কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো। তারা কোনোভাবেই পরাজয় মেনে নিতে রাজি নয়।

তবে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কর্মকর্তারা জনসমক্ষে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ হিসেবেই তুলে ধরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
ম্যাসাচুসেটসের কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী সহসভাপতি ত্রিতা পারসি সিএনএনকে বলেন, ‘যুদ্ধের আগের তুলনায় ইরানের বিভিন্ন পক্ষ এখন অনেক বেশি একসারিতে রয়েছে। কারণ, এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিধি বা সার্কেল অনেক ছোট। আয়াতুল্লাহ খামেনির সময়কার বিধিনিষেধের তুলনায় এখন ছোট দলটি যুদ্ধকৌশলের বিষয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ।’
চলতি সপ্তাহে ইসলামাবাদে আলোচনায় বসা নিয়ে নানা গুঞ্জনের মধ্যেও তেহরান তাদের অবস্থানে অনড় ছিল যে তাদের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেবেন না। তারা উল্টো ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন ও সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রে ‘গভীরতার অভাব’ থাকার অভিযোগ তুলেছে। এমনকি যুদ্ধের আগে খামেনির সময়কার যে ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা ছিল, যেমন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন এবং ইরানি প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন—এসব বিষয়েও বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা বজায় রেখেছে ইরান।
ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের মধ্যে কোনো বিভক্তির খবরকে পাত্তা দিতে রাজি নয়। তারা বারবার নিজেদের সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশলের ঐক্যবদ্ধ রূপ তুলে ধরছে। গত বুধবার ইরানের প্রেসিডেন্টের উপমুখপাত্র মেহেদী তাবাতাবাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘শীর্ষ নেতাদের বিভক্তি নিয়ে কথা বলা প্রতিপক্ষের একটি পুরোনো রাজনৈতিক চাল ও প্রোপাগান্ডা। বর্তমান সময়ে রণক্ষেত্র, সাধারণ জনগণ এবং কূটনীতিকদের মধ্যে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে, তা নজিরবিহীন ও উল্লেখযোগ্য।’

এ ঐক্য ফুটিয়ে তুলতে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে সামনে আনা হয়েছে। বিপ্লবী গার্ডের সাবেক এই কমান্ডার ইসলামাবাদের প্রথম দফার আলোচনায় ইরানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বর্তমানে তাঁকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ত্রিতা পারসি মনে করেন, গালিবাফ যখন সব ঘরানার কর্মকর্তাদের নিয়ে ইসলামাবাদে গিয়েছিলেন, সেটা ছিল মূলত একটি সুপরিকল্পিত ঐক্যের মহড়া। তিনি বলেন, ‘(ইরানি নেতৃত্বে) মতভেদ কি আছে? অবশ্যই আছে। কিন্তু উভয় পক্ষ যে চুক্তিতে পৌঁছাতে পারছে না, তার কারণ ট্রাম্পের বিভ্রান্তিকর বার্তা। এটাকে ইরানের নেতৃত্বের বিভক্তি বলা বাস্তবতাবর্জিত।’
সিএনএনের তথ্যমতে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাত সপ্তাহের যুদ্ধ শেষ করতে চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিল। কিন্তু ট্রাম্প যখন আলোচনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিতে শুরু করেন এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন, তখন পরিস্থিতি বদলে যায়।
অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার হুমকির মুখে ইরান গত পাঁচ দশকের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী শাসনকাঠামো বদলে ফেলেছে। যেখানে আগে বিভিন্ন পক্ষ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকত, সেখানে নতুন ‘যুদ্ধকালীন কাঠামো’ অনুযায়ী সব আলোচক ও রাজনৈতিক কর্মীকে একটি একক সামরিক প্ল্যাটফর্মের নিচে আনা হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছেন যে ট্রাম্পের এমন মন্তব্য আলোচনার জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। কারণ, ইরান এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রকে চরম অবিশ্বাস করে।
অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার হুমকির মুখে ইরান গত পাঁচ দশকের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী শাসনকাঠামো বদলে ফেলেছে। যেখানে আগে বিভিন্ন পক্ষ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকত, সেখানে নতুন ‘যুদ্ধকালীন কাঠামো’ অনুযায়ী সব আলোচক ও রাজনৈতিক কর্মীকে একটি একক সামরিক প্ল্যাটফর্মের নিচে আনা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো, কোনো পরাজয় স্বীকার না করে সংকট থেকে বের হওয়া।
অন্যদিকে রাজপথে ইরানের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোও প্রতিদিন বিক্ষোভ করছে। তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, যেখানে ইরানকে পরাজিত হিসেবে দেখানো হবে। কট্টরপন্থীদের এই মনোভাব পার্লামেন্ট ও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমেও প্রকট।

সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যখন বলেছিলেন ‘হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত’, তখন কট্টরপন্থীরা বিরোধিতা করেন। ফলে অন্য কর্মকর্তাদের দ্রুত পরিস্থিতির স্পষ্টীকরণ করতে হয়েছিল।
এই যুদ্ধকালীন শাসনব্যবস্থা গত ৩৭ বছরে খামেনির শাসন থেকে একেবারেই আলাদা। তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি দেশের হাল ধরলেও তিনি অন্তরালে রয়েছেন। বিভিন্ন খবরে বলা হচ্ছে, তিনি আহত বা গুরুতর অসুস্থ। ফলে তিনি অধীনদের স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে পারছেন কি না, নাকি কর্মকর্তারা স্রেফ অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের হামিদেজা আজিজি বলেন, ‘পুরো ব্যবস্থা এখন ভিন্নভাবে চলছে। আগে সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ছিল, যারা বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আলোচনা করে সর্বোচ্চ নেতাকে পরামর্শ দিত এবং তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন সর্বোচ্চ নেতার কাছে সবার নিয়মিত যাওয়ার সুযোগ নেই। এর অর্থ হলো, যুদ্ধ বা শান্তির মতো বড় বিষয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের হাতে এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বা সুযোগ অনেক বেশি।’