বিশ্বের শীর্ষ প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীদের কয়েকজনকে ঘিরে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চীনে তারা গভীর রাতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন। আর আমেরিকায় তারা হঠাৎ করেই নিখোঁজ হচ্ছেন। এদের সবাই কাজ করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, হাইপারসনিক অস্ত্র, পারমাণবিক গবেষণা এবং মহাকাশ প্রতিরক্ষার মতো সামরিক প্রযুক্তির অত্যাধুনিক খাতে। এই ঘটনাগুলো নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম দিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রশ্ন সামনে আনছে। তাহলো, এটি কি কেবলই কাকতালীয়, নাকি সুপরিকল্পিত কোনো চক্রান্ত? এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।
ওয়াশিংটনে পারমাণবিক প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা ও উন্নত অস্ত্র সংশ্লিষ্ট কমপক্ষে ১১টি ঘটনার তদন্ত চলছে। বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও পৌঁছেছে। রিপাবলিকান প্রতিনিধি এরিক বার্লিসন সম্ভাব্য ‘বিদেশি অপারেশন’-এর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, আমরা পারমাণবিক প্রযুক্তি, উন্নত অস্ত্র ও মহাকাশ খাতে চীন, রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আছি। অথচ আমাদের শীর্ষ বিজ্ঞানীরা একের পর এক নিখোঁজ হচ্ছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে ‘খুবই গুরুতর বিষয়’ বলে উল্লেখ করেছেন, যদিও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন এটি হয়তো কাকতালীয় হতে পারে। ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন ইতিমধ্যে এ বিষয়গুলোতে তদন্ত শুরু করেছে।
চীনে রহস্যময় মৃত্যু
প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারে চীন ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, একই ধরনের সংবেদনশীল খাতে কাজ করা কমপক্ষে ৯ জন বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কারণ হিসেবে দুর্ঘটনা, হঠাৎ অসুস্থতা বা অজ্ঞাত কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বয়স ছিল ২৬ থেকে ৬৮ বছরের মধ্যে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো ফেং ইয়াংহে। ৩৮ বছর বয়সী এই অধ্যাপক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজিতে কর্মরত ছিলেন। তিনি জুলাই ২০২৩-এ বেইজিংয়ে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক পরিস্থিতির সিমুলেশন মডেল নিয়ে কাজ করছিলেন ফেং। রাষ্ট্রীয় প্রতিবেদনে বলা হয়, রাত প্রায় ২টা ৩৫ মিনিটে একটি বৈঠক শেষে ফেরার পথে দুর্ঘটনাটি ঘটে। একটি সরকারি বিজ্ঞান বিষয়ক প্ল্যাটফর্ম তাকে ‘সরকারি দায়িত্ব পালনকালে আত্মোৎসর্গকারী’ হিসেবে উল্লেখ করে। যা সাধারণত সামরিক সদস্যদের জন্য ব্যবহৃত হয়। পরে তাকে বাবাওশান কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সেখানে সাধারণত কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ ব্যক্তি ও রাষ্ট্র স্বীকৃত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সমাধি দেয়া হয়।
চীনের সামরিক উন্নয়ন পর্যবেক্ষণকারী এক গবেষক নিউজউইককে বলেন, এই ঘটনার কিছু দিক অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার সময় এবং মৃত্যুর বর্ণনা। তিনি বলেন, তাইওয়ান সম্পর্কিত এআই সিমুলেশনের একজন মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন ফেং। গভীর রাতে এমন দুর্ঘটনা হওয়াটা খুবই অস্বাভাবিক।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, একজন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিকে সাধারণত ‘আত্মোৎসর্গকারী’ বলা হয় না।
আরও কয়েকটি মৃত্যু
এটি কোনো একক ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাজ করা আরও কয়েকজন চীনা বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন-
চেন শুমিং (৫৭)। তিনি মাইক্রোইলেকট্রনিক্স বিশেষজ্ঞ। ২০১৮ সালে একই ধরনের ঘটনায় মৃত্যু হয় তার।
ফেং ইয়াংহে। জুলাই ২০২৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনা মারা যান।
ঝৌ গুয়াংইউয়ান। ডিসেম্বর ২০২৩ সালে অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু হয়।
লিউ দংহাও। মার্চ ২০২৪ সালে অজ্ঞাত দুর্ঘটনায় মারা যান।
ঝ্যাং শিয়াওশিন (৬২)। তিনি মহাকাশ বিশেষজ্ঞ। ডিসেম্বর ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।
ঝ্যাং দাইবিং (৪৭)। ড্রোন বিশেষজ্ঞ। জানুয়ারি ২০২৫ সালে মারা যান। কারণ অজানা।
লি মিনইয়ং বায়োমেডিক্যাল রসায়নবিদ। নভেম্বর ২০২৫ সালে হঠাৎ অসুস্থতায় মারা যান।
ফাং দাইনিং হাইপারসনিক বিশেষজ্ঞ। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে বিদেশে অসুস্থতায় মারা যান।
ইয়ান হং হাইপারসনিক গবেষক। মার্চ ২০২৬ সালে অসুস্থতায় মৃত্যু হয়।
এই বিজ্ঞানীদের অনেকেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাজ করছিলেন। বিশেষ করে সামরিক এআই, হাইপারসনিক প্রযুক্তি এবং উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থা।
গবেষকটি বলেন, হাইপারসনিক, সামরিক এআই, এমনকি স্বর্মিং প্রযুক্তির সিমুলেশন- এই ক্ষেত্রগুলোতেই বেশি ঘটনা দেখা যাচ্ছে। তবে তিনি এটিও যোগ করেন, কিছু ঘটনা সম্পূর্ণ দুর্ঘটনাও হতে পারে।
কোনো প্রমাণ নেই, তবে সন্দেহ রয়ে গেছে
বর্তমানে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া বা অন্য কোনো দেশ বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য করে সমন্বিত অভিযান চালাচ্ছে। তবে অতীতে এমন উদ্বেগ দেখা গেছে। উদাহরণ হিসেবে, ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের ওপর ইসরাইল বহু বছর ধরে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ধীর করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হয়। এ ঘটনাগুলো এখনো রহস্যে ঘেরা। প্রশ্নটি রয়ে গেছে- এগুলো কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি বৈশ্বিক শক্তির ছায়াযুদ্ধের অদৃশ্য অধ্যায়?