Image description

লেবাননে সামরিক অভিযানের নামে ইসরায়েল যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তা স্মরণকালের ইতিহাসে ভয়াবহ। ইসরায়েলি বাহিনী দেশটিতে বৃষ্টির মতো বোমা ফেলেছে। বৈরুতের সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় এসব হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। ঘরবাড়ি, ভবন ও স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। দখলদার বাহিনী এক উন্মত্ত ধ্বংসযজ্ঞ দেখিয়েছে। ৯০ সেকেন্ডে ১০০টি স্থানে বোমা হামলা চালানো হয়, যা গত দুই বছরে লেবাননে ইসরায়েলের অন্যতম প্রাণঘাতী বোমা হামলা। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।  

লেবাননে গত ১৬ এপ্রিল ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। ইসরায়েল স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই চুক্তি লঙ্ঘন করে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন গ্রামে গোলাবর্ষণ করতে একটুও দেরি করেনি। মিডল ইস্ট আই এক বিশ্লেষণে বলেছে, গত ৮ এপ্রিল ছিল সেই ভয়ংকর দিন। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী লেবাননের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ইটারনাল ডার্কনেস’ নামক এক উন্মত্ত অভিযান শুরু করে, যার ফল ছিল প্রত্যাশিতভাবেই ভয়াবহ। মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে ইসরায়েল দেশজুড়ে শতাধিক স্থানে হামলা চালায়। এতে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং অন্তত এক হাজার ১৫০ জন আহত হয়। দিনটি ‘কালো বুধবার’ আখ্যা পেয়েছে। 

গত সপ্তাহে ইসরায়েল তার স্বাভাবিক কার্যপদ্ধতি বদলে ফেলে। নির্দিষ্ট সাম্প্রদায়িক ভৌগোলিক অঞ্চলে অর্থাৎ শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোকে হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি আখ্যা দিয়ে অমানবিক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।   
ইসরায়েলের এই হামলার কদর্য রূপ নিয়ে ফিলিস্তিনি গবেষক ও প্রয়াত এডওয়ার্ড সাঈদের বোন জ্যাঁ সাঈদ মাকদিসি সেই ১৯৮২ সালের বোমাবর্ষণের যে ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছিলেন তার সঙ্গে মিলে যায়। মাকদিসি এক বইতে লেখেন, ‘মনে হচ্ছিল যেন ইসরায়েলিরা হিংস্র ঘৃণার এক উন্মত্ত আক্ষেপে পৌঁছে গেছে; যা শহরটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এক উন্মাদ, ধ্বংসাত্মক তাড়না।’

লেবাননে দুই দিনে ইসরায়েলের ২ সেনা নিহত
গত দুই দিনে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের দুই সেনা নিহত হয়েছে। যুদ্ধবিরতির মধ্যেই এ ঘটনা ঘটে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ জানিয়েছে, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে মোট ১৫ ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে। আরও ১২ সেনা আহত হয়। 

যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে পাঁচ শর্ত দিয়েছে হিজবুল্লাহ
লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসন থামাতে এবং স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে পাঁচটি শর্ত দিয়েছে হিজবুল্লাহ। সংগঠনটির মহাসচিব শেখ নাইম কাশেম শনিবার রাতে প্রকাশিত এক বার্তায় ইরানের সহায়তার প্রশংসা করেন এবং লেবাননে এই যুদ্ধবিরতিতে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অভূতপূর্ব সক্ষমতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ফ্রন্টলাইনে থাকা প্রতিরোধ যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ছাড়া যুদ্ধবিরতি সম্ভব হতো না। হিজবুল্লাহর শর্তগুলো হলো আকাশ, স্থল ও সমুদ্র– সব জায়গায় লেবাননের বিরুদ্ধে আগ্রাসন স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। ইসরায়েলি বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সীমান্ত লাইনে ফিরে যেতে হবে। বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের তাদের শহর ও গ্রামে ফিরে যেতে দিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক ও আরব সহায়তায় পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করতে হবে এবং সেটি হবে জাতীয় দায়িত্বের ভিত্তিতে।

হামলার মধ্যেই ঘরে ফিরছে বাস্তুচ্যুত পরিবার
যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। সীমান্তের কাছে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণ ও বাড়িঘর ধ্বংস করা সত্ত্বেও হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত লেবানিজ পরিবার তাদের দক্ষিণের মাতৃভূমিতে ফিরতে শুরু করেছে। গত শনিবার তোশক, ব্যাগ ও পতাকা বোঝাই যানবাহনের স্রোত দেখা গেছে সড়কে। লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই সংঘাত চলাকালীন ইসরায়েলি হামলায় প্রায় দুই হাজার ৩০০ জন নিহত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের অধিকাংশই দক্ষিণ লেবানন এবং বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরের বাসিন্দা।