Image description

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের পাল্টা হিসেবে ইরান থেকে তৈরি করা লেগো-স্টাইলের কিছু ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচনার সৃষ্টি করেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বানানো ইরানের লেগো সিরিজের বেশ কয়েকটি ভিডিও বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি ‘বয়ানযুদ্ধ’ বা ন্যারেটিভ ওয়ারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরানের এই লেগো ভিডিওগুলোতে বিশ্বজুড়ে মার্কিন ‘শাসন ও শোষণের’ বিরুদ্ধে নানা প্রতিবাদ দেখা যায়।

প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান পৃথিবীতে সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি ডিজিটাল দুনিয়াও যে ‘ভিন্নরকম এক রণাঙ্গন’ হয়ে উঠেছে তার জোরাল প্রমাণ সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ। ডিজিটাল দুনিয়ায় অভিনব এই যুদ্ধের নাম বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন ‘ন্যারেটিভ ওয়ার’ বা ‘বয়ানযুদ্ধ’।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানা রকম ‘বয়ানের’ বিরুদ্ধে ইরানের তৈরি ‘লেগো ভিডিও’ সিরিজ এক বিশাল ‘প্রপাগান্ডা’ যুদ্ধে জয়লাভ করেছে।

শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আল জাজিরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বানানো ইরানের লেগো সিরিজের বেশ কয়েকটি ভিডিওর বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরেছে। প্রতিটি ভিডিওর চরিত্রই শিশুদের খেলনা লেগোর আকারে তৈরি। এছাড়া সব ভিডিওতেই বিশ্বজুড়ে মার্কিন ‘শাসন ও শোষণের’ বিরুদ্ধে নানা প্রতিবাদ দেখা যায়।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, জোছনাস্নাত জনশূন্য প্রান্তরে ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছেন এক আদিবাসী আমেরিকান নেতা। অ্যানিমেটেড ভিডিওটি দ্রুত মার্কিন সরকারের হাতে নিগৃহীত বিভিন্ন মানুষের ছবির মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়, যাদের মধ্যে শেকলবন্দি কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান থেকে শুরু করে ইরাকের কুখ্যাত আবু গারিব কারাগারের বেঁচে যাওয়া বন্দিরাও রয়েছেন।

এরপর দৃশ্যটি ঘুরে যায় ইরানি সৈন্যদের দিকে, যারা ক্ষেপণাস্ত্রের গায়ে বড় বড় ব্যানার লাগাচ্ছে। এর মধ্যেই আবহ সংগীতের তাল দ্রুত হতে থাকে। প্রথম ব্যানারে লেখা, ‘ছিনিয়ে নেওয়া কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য।’ পরেরটিতে আসে, “হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানুষের জন্য।”

আরেকটি ব্যানারে লেখা দেখা যায়, ‘ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫-এর নিহতদের স্মরণে’, যা ১৯৮৮ সালে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত ইরানের যাত্রীবাহী বিমানটির কথা মনে করিয়ে দেয়। ওই বিমানে বিধ্বস্ত হয়ে ২৯০ আরোহীর সবাই নিহত হয়েছিলেন।

এরপর ব্যানার আসে, ‘র‍্যাচেল কোরির স্বাধীনতার সংগ্রামের স্মরণে’। আমেরিকান অ্যাক্টিভিস্ট র‌্যাচেল কোরি ২০০৩ সালে গাজায় ইসরায়েলি বুলডোজারের নিচে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম এবং ইরাকে মার্কিন যুদ্ধ ও নির্যাতনের শিকার মানুষ, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে বিতের্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠা ‘এপস্টেইন দ্বীপের শিশুরাও’ একই ধরনের বার্তা পায়, যা ক্ষেপণাস্ত্রের গায়ে ব্যানার আকারে লাগিয়ে দেওয়া হয়।

ভিডিওটি শেষ হয় ব্যানার লাগানো সেসব ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিশাল দুটি মূর্তি ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে।

সব শেষে সাদা বড় অক্ষরে একটি লাইন ভেসে ওঠে: ‘সবার জন্য একটি প্রতিশোধ’

আল জাজিরা বলছে, ২৯ মার্চের এই ভিডিওটি ‘এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া’ প্রকাশিত অনেকগুলো ভিডিওর একটি। ‘এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া’ ইরানভিত্তিক বেশ কয়েকটি গ্রুপের অন্যতম, যারা বিশ্বজুড়ে পরিচিত লেগো ফিগার এবং ব্লক ব্যবহার করে একটি ভাইরাল ‘সোশাল মিডিয়া ট্রেন্ড’ তৈরি করেছে।

এর মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তেহরানের ‘বয়ানকে’ শক্তিশালী করছে।

মার্কিন ‘আগ্রাসন এবং অভ্যন্তরীণ অপরাধের শিকার’ বহু মানুষকে চিত্রিত করা এই ভিডিওটি এক্স-এ (সাবেক টুইটার) প্রায় দেড় লাখ বার দেখা হয়েছে। তবে ইউটিউব সম্প্রতি এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার অ্যাকাউন্টটি মুছে দিয়েছে।

তারপরও তেহরানভিত্তিক এই গ্রুপটি হাল ছাড়ছে না। তারা ট্রাম্পকে উপহাস করতে নানা রকম ভিডিওতে বিশেষ ‘লিরিক’ এবং ‘র‍্যাপ বিট’ ব্যবহার করছে- যেখানে প্রায়ই খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের কথা ব্যবহার করে তাকে ‘ভণ্ডামির’ জন্য অভিযুক্ত করা হয়।

প্রতিটি ভিডিওতেই দেখানো হয়, ট্রাম্প আসলে মার্কিন স্বার্থের চেয়ে ইসরায়েলের স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।

এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার এক প্রতিনিধি আল জাজিরাকে বলেন, “আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটি ‘সহিংসতা প্রচারের’ অভিযোগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যদিও আমরা নিশ্চিত যে, লেগোর মতো ব্রিক অ্যানিমেশনগুলো মোটেও সহিংস নয়। তারপরও আমরা হতাশ না। আমরা ভালো করেই জানি, পশ্চিমা বিশ্ব কীভাবে সত্যকে নীরবতায় ঢেকে দেয় এবং সত্য বলা প্রতিটি কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করে।”

আল জাজিরা বলছে, এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার ভিডিওগুলো শিয়া মুসলিম ইতিহাসের গভীর প্রতিফলন থেকে শুরু করে আধুনিক র‍্যাপ ধাঁচের মিউজিক ভিডিও পর্যন্ত বিস্তৃত।

এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার এক মুখপাত্র বলেন, “অ্যানিমেশনে ব্যবহৃত সবুজ এবং লাল রঙ অত্যন্ত প্রতীকী। সবুজ রং রাসুল (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রা.)-এর ঐতিহ্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে লাল রঙ অত্যাচারীর প্রতীক।”

আরেকটি ভিডিওতে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনকে বোঝাতে ‘এপস্টেইন শাসন’, ‘লুজার’ এর মত শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। সেখানে ট্রাম্প সমর্থকদের দেখানো হয়েছে লাল টুপি পরা অবস্থায়।

ভিডিওতে ট্রাম্পের নতুন কোনো যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি এবং সাধারণ কর্মজীবী মানুষের পাশে থাকার কথা বলা হলেও, পরে তার নিজের কথা দিয়েই তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়।

এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার মুখপাত্র বলেন, “আমাদের সেরা সৃষ্টিগুলোর একটি ‘লুজার’। ট্রাম্প প্রায়ই তার বিরোধীদের এই নামে ডাকেন। তাই আমরা বিষয়টিকে উল্টে দিয়েছি এবং দেখিয়েছি যে শেষ পর্যন্ত তিনিই সবচেয়ে বড় ‘লুজার’।”

লেবাননের জনগণের উদ্দেশেও একটি ভিডিও তৈরি করেছে এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া, যেখানে বলা হয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ডস কোর-আইআরজিসি তাদের ছেড়ে যাবে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ভিডিওগুলো তৈরির নেপথ্যে ১০ জনের একটি দল কাজ করে, যাদের সবার বয়স ১৯ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। স্পষ্টতই তাদের ইন্টারনেটে অবাধ প্রবেশাধিকার রয়েছে, যদিও ইরান সরকার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সাধারণ মানুষদের জন্য মার্কিন মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মগুলো ব্লক করে রেখেছে।

আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার মুখপাত্র স্বীকার করেন, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের গ্রাহকদের মধ্যে অন্যতম, তবে তাদের গ্রুপটি স্বাধীন।

তিনি বলেন, “আমরা উচ্চমানের কন্টেন্ট তৈরি করি, তাই স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম মাঝে মাঝে প্রচারের জন্য আমাদের কাজ কিনে নেয়। এতে আমাদের স্বাধীনতা পুরোপুরি বজায় থাকে।”

কেবল এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া নয়, ‘পার্সিয়াবয়’ ও ‘সাদার্ন পাঙ্ক’ নামেও দুটি সাইট লেগো এবং থিমযুক্ত একই ধরনের ভিডিও তৈরি করেছে। এই ধারাটি ইরানের বাইরে পাকিস্তানেও ছড়িয়ে পড়েছে।

ইসলামাবাদভিত্তিক সামাজিক বিশ্লেষক ফাসি জাকা বলেন, “লেগো-স্টাইলের এই ভিডিওগুলোর বুদ্ধিমত্তা হল কীভাবে তারা পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের তৈরি করা ইরানবিরোধী বয়ানকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ভিডিওগুলো যুদ্ধের সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে থাকা তথ্যের বলয় ভেদ করার একটি উপায়।”

জাকা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ফাটলগুলো- যেমন ‘এপস্টেইন ফাইল’-কে উপাদান হিসেবে ব্যবহার করাটা ছিল অত্যন্ত চতুর চাল। যুদ্ধের প্রথম দিনে মার্কিন হামলায় ইরানে মিনাব বালিকা বিদ্যালয়ের ১৬০ জনেরও বেশি স্কুলছাত্রীর মৃত্যুর কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।

তার মতে, লেগোর মতো শিশুদের প্রিয় ব্র্যান্ড ব্যবহার করে এই বার্তা দেওয়াটা একটি গভীর অর্থ বহন করে।

কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, গণমাধ্যম গবেষক মার্ক ওয়েন জোন্স বলেন, ‘বয়ানযুদ্ধে জেতার জন্য ইরানের প্রচেষ্টা তাদের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কারণ তারা জানে যে সামরিকভাবে তারা জিততে পারবে না।

“তাদের সাফল্যের সেরা উপায় হলো জনমতকে নিজেদের পক্ষে রাখা, যা যুক্তরাষ্ট্রকে থামতে চাপ দেবে। আর এই যুগে যোগাযোগের খেলায় ট্রলের মাধ্যমে ‘কড়া কথায় প্রতিপক্ষককে ঘায়েল করার’ প্রচারই জয়ী হয়।”

শীর্ষনিউজ