Image description

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে চীনের নতুন উত্তেজনা শুরু হয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে তেহরানকে অস্ত্র দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে ওয়াশিংটন। অকাট্য প্রমাণ না থাকলেও গোয়েন্দা ও তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্লেষণের বরাতে এমন তথ্য দিচ্ছে সংবাদমাধ্যমগুলোও। সবশেষ ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু বানাতে চীনের গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ব্যবহার করেছে ইরান। গত সপ্তাহে খবর বের হয়েছিল তেহরানকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অস্ত্র দিতে যাচ্ছে বেইজিং। যদিও তারা এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে অস্ত্র না দিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে চিঠি দিয়েছেন। পাশাপাশি এমনটা ঘটলে শুল্কারোপেরও হুমকি দিয়েছেন, যা নিয়ে রীতিমতো ক্ষুব্ধ চীন। এ অবস্থায় হরমুজে নৌ অবরোধ দেওয়ায় চটেছেন শি। একে ‘জঙ্গলের আইন’ বলে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এ অজুহাতে পদক্ষেপ নিলে চীন অবশ্যই এর দাঁতভাঙা জবাব দেবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। কার্যত ইরান যুদ্ধ নিয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চরম উত্তেজনার দৃশ্যমান রূপটির সূত্রপাত হয়েছে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে। তিনি ঘোষণা দেন, কোনো দেশ যদি ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ করে, তবে তাদের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। এ হুমকি মূলত চীনসহ ইরানের সম্ভাব্য সহযোগীদের লক্ষ্য করেই দেওয়া হয়েছে।

টাইমস নাও বলছে, এখানে স্পষ্টত লক্ষ্য চীন। যার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্পের নজর পড়েছে মালাক্কা প্রণালিতে। সংঘাতের কেন্দ্র হরমুজ প্রণালিতে সূত্রপাত করলে এটি ঘুরে মালাক্কায়ও যেতে পারে।

আর নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধকে ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন— এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় এখন ইরানের তেলবাহী চীনা জাহাজ আটকে দেওয়া হলে দুই দেশের সম্পর্ক এক নতুন সংকটে পড়বে।

ইরানকে অস্ত্র দেওয়ার মার্কিন অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানকে অস্ত্র সরবরাহের খবর ‘পুরোপুরি বানোয়াট’ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই অভিযোগকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নতুন শুল্ক আরোপ করে, তবে চীনও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চীন এরই মধ্যে সম্ভাব্য পাল্টা অর্থনৈতিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ওয়াশিংটন কার্যত ইরানের সমুদ্রপথে বাণিজ্য সীমিত করে দিয়েছে, যা অনেক বিশ্লেষকের মতে এক ধরনের নৌ অবরোধ।

রয়টার্স জানিয়েছে, এই পদক্ষেপের ফলে ইরানের তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের উপস্থিতি কমে গেছে। তেল ও গ্যাস স্থাপনা, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, বন্দর, রেলপথ, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব অবকাঠামো পুনর্গঠনে বহু বছর সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থায় ইরানের অর্থনীতি দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। যুদ্ধ, অবরোধ ও অবকাঠামোগত ক্ষতির সম্মিলিত প্রভাবে দেশটির অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ এরই মধ্যে কয়েকশ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ইরানের অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মানবিক সংকটও ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্য সীমাবদ্ধতার কারণে ওষুধ ও প্রযুক্তিগত পণ্য আমদানিও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

এই পুরো পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এ কৌশলগত পথের ওপর প্রভাব বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে চীন তার জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি ‘প্রক্সি প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র উদাহরণ। এখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে ইরানকে কেন্দ্র করে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্ত করছে।

যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে, আর চীন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝখানে পড়ে ইরান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অর্থনৈতিক যুদ্ধের সম্ভাবনা। ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

তবে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়নি। উভয় পক্ষই কৌশলগতভাবে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। চীন সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না, আর যুক্তরাষ্ট্রও বহুমুখী সংঘাতের ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক। কিন্তু ইতিহাস বলে, এ ধরনের উত্তেজনা অনেক সময় অপ্রত্যাশিতভাবে বিস্ফোরিত হতে পারে।

এ পরিস্থিতির মধ্যে গত মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন শি। ট্রাম্পের নাম না নিলেও তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশ্ব যেন ‘জঙ্গলের আইনে’ ফিরে না যায়। আবুধাবির যুবরাজের সঙ্গে বৈঠকে তিনি ইঙ্গিত দেন, আন্তর্জাতিক আইনকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করা বা ছুড়ে ফেলা গ্রহণযোগ্য নয়।

যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই কিনত চীন। গত সোমবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী যখন চীনা পতাকাবাহী কার্গো জাহাজগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়, তখন বেইজিংয়ের সুর কঠোর হয়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, এই ‘লক্ষ্যভিত্তিক অবরোধ’ নাজুক যুদ্ধবিরতিকে বিপন্ন করবে। কারণ ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চুক্তি রয়েছে বেইজিংয়ের।

এর মধ্যে টাইমস নাও সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে ট্রাম্পের নজর পড়েছে মালাক্কা প্রণালির ওপর। এ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল চীন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যকার সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তি মালাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও নজরদারি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

মালাক্কা প্রণালি ভারত মহাসাগর ও পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্ত করে এবং এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর যৌথভাবে এ পথের ব্যবস্থাপনা করে। হরমুজ প্রণালি যেখানে মূলত তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে মালাক্কা প্রণালি বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন। বিশেষ করে চীন এই রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যা ‘মালাক্কা ডিলেমা’ নামে পরিচিত।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এ ভৌগোলিক সুবিধা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারে সহায়ক হতে পারে, বিশেষ করে চীনের প্রভাব মোকাবিলার ক্ষেত্রে। তবে, মালাক্কা প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বাস্তবায়ন সহজ হবে না, কারণ ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব নিয়ে সংবেদনশীল অবস্থান ধরে রেখেছে। আর এর অন্য প্রান্তে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ব্যাপক সামরিক সক্ষমতা রয়েছে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক রুশ ডোসি মনে করেন, এআই চিপ বা খনিজ সম্পদের লড়াই নয়, বরং ইরান ইস্যুই যুক্তরাষ্ট্র-চীন সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ হতে পারে।