ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার চার দিন পর অবশেষে বিশ্ববাসী মোজতবা খামেনির দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে পারল। খামেনি—যিনি এখন আয়াতুল্লাহ পদে উন্নীত হয়েছেন এবং অনুসারীদের কাছে ইসলামি বিপ্লবের ‘মহান নেতা’ (Exalted Leader) হিসেবে আখ্যায়িত হচ্ছেন—ভিডিও বা অডিও বার্তায় সামনে আসেননি।
এর পরিবর্তে, তিনি একটি দীর্ঘ লিখিত বার্তা পাঠিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে পড়ে শোনানো হয়। এতে যুদ্ধের গতিপথ নিয়ে তাঁর মতামত, সশস্ত্র বাহিনীর প্রশংসা এবং হামলাকারীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়েছে।
বার্তাটি দ্রুত তাঁর দপ্তরের নতুন একটি টেলিগ্রাম চ্যানেলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে তাঁর সমর্থকদের চাঙ্গা করতে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে তিনটি হাতের লেখার নমুনা প্রকাশ করা হয়েছে—প্রথম সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি, নিহত আলী খামেনি এবং খোদ মোজতবার। বার্তাটি স্পষ্ট: একটি নতুন যুগের সূচনা হয়েছে এবং তিনি নিজেকে পূর্বসূরিদের যোগ্য উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, খামেনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন থেকেই নিজের নিয়োগের খবর জানতে পারেন, যা ইঙ্গিত দেয় তিনিও এতে অবাক হয়েছিলেন। তিনি তাঁর প্রয়াত বাবাকে নিয়ে আবেগঘন ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি দাবি করেন, মৃত্যুর পর তিনি বাবার মরদেহ দেখেছেন এবং শেষ প্রতিরোধের চিহ্ন হিসেবে বাবার হাত মুষ্টিবদ্ধ ছিল। উল্লেখ্য, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বিমান হামলায় আলী খামেনি নিহত হন।
খামেনির বার্তায় ছিল চিরাচরিত চড়া সুর। তিনি ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’ বা হিজবুল্লাহর মতো প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রশংসা করেছেন, যদিও সেগুলো এখন বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোকে মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ করার আহ্বান জানান এবং অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থে আঘাত অব্যাহত রাখার হুমকি দেন। বিশ্ববাজারকে আরও অস্থির করে দিয়ে তিনি হরমুজ প্রণালী—যা বিশ্ব তেল বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট—বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে অটল থাকার ঘোষণা দেন।
‘হুমকি আর আস্ফালন’
দীর্ঘদিন আড়ালে থাকার পর নেতৃত্বের আলোয় আসা খামেনি তাঁর বাবার নীতির মতোই নিজের নীতিগুলো তুলে ধরেন। বাবার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আপনার প্রস্থান হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে... অনেকে আপনার প্রকৃত মূল্য বুঝতে পারেনি। হয়তো সব পর্দা সরতে আরও বহু বছর সময় লাগবে।”
সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করার কোনো ইঙ্গিত তিনি দেননি, কিংবা তেহরানের কাছে গ্রহণযোগ্য ফলাফল কী হতে পারে, তাও স্পষ্ট করেননি। বরং নিহতদের ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার বিষয়টি ‘অমিমাংসিত ফাইল’ হিসেবেই থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ইরান বিশ্লেষক আরাশ আজিজি সিএনএনকে বলেন, খামেনির বার্তায় কোনো সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নেই এবং বাবার মূল নীতিগুলো থেকে সরে আসার কোনো লক্ষণও নেই। এটি ইরানিদের জন্য ভালো ভবিষ্যতের খুব কম আশাই জাগায়। আজিজি আরও বলেন, “এর পরিবর্তে এটি হুমকি আর আস্ফালনে পূর্ণ। ইসরায়েল ধ্বংস করা এবং অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে হটানোর সেই পুরনো বুলিই আওড়ানো হয়েছে। সংক্ষেপে, এটি ইরান ও প্রতিবেশীদের জন্য অনন্ত সংঘাত ছাড়া আর কিছুই দিচ্ছে না।”
তবে মূল প্রশ্নটি এখনো উত্তরহীন: ইরানের জনগণ বা বিশ্ববাসী এখনো নতুন নেতাকে সশরীরে দেখেনি বা তাঁর কণ্ঠ শোনেনি। যুদ্ধের শুরুর দিকে তিনি আহত হয়েছিলেন বলে খবর রয়েছে। এই বিবৃতি তাঁর সমর্থকদের সন্তুষ্ট করতে পারে, কিন্তু আসলে কলকাঠি কে নাড়ছে, তা পরিষ্কার নয়।
জেনেভাভিত্তিক ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারি সিএনএন-কে বলেন, এর উদ্দেশ্য হলো অবাধ্যতা বা প্রতিরোধ প্রদর্শন করা। তিনি বলেন, “ইরান স্পষ্টভাবে বোঝাচ্ছে যে তারা যুদ্ধবিরতি বা যুদ্ধ শেষ করতে চায় না। তারা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে এখনো যথেষ্ট মূল্য চোকাতে হয়নি। আমার মনে হচ্ছে, এই পরিস্থিতি চলতেই থাকবে।”
সূত্র : সিএনএন
আরটিএনএন