ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকারের ভূমিকাকে 'মেরুদণ্ডহীন ও ভীরু' আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রখ্যাত লেখিকা অরুন্ধতী রায়। লেখিকা বলেন, ভারত সরকারের এমন অবস্থানে তিনি লজ্জিত।
দিল্লিতে আয়োজিত বই-সংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে অরুন্ধতী রায় বলেন, ইরান যখন আমেরিকার চোখে চোখ রেখে লড়াই করছে, ভারত তখন ভয়ে কুঁকড়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, 'একসময় আমরা দরিদ্র দেশ ছিলাম। কিন্তু আমাদের আত্মসম্মান ও মর্যাদা ছিল। আজ দেশ ধনী হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এদেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ আজ অত্যন্ত দরিদ্র ও বেকার। তাদেরকে প্রকৃত খাদ্যের বদলে ঘৃণা, বিষ এবং মিথ্যার খোরাক দেওয়া হচ্ছে। সিনেমা ছাড়া আর সবখানে আমরা আত্মসম্মান, মর্যাদা ও সাহস হারিয়ে ফেলেছি।'
অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ ও হত্যার মতো ঘটনায় আমেরিকার সমালোচনা বা প্রতিবাদ করতে না পারায় ক্ষোভ উগরে দিয়ে অরুন্ধতী বলেন, 'আমরা কেমন জাতি যে অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের অপহরণ ও হত্যা করার পরও আমাদের নির্বাচিত সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিন্দা জানানোর সাহস পায় না?'
ইরানে হামলার ঠিক কয়েক দিন আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরায়েল সফর এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আলিঙ্গন করা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। অরুন্ধতী বলেন, 'ইরানে হামলার মাত্র কয়েক দিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফর এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আলিঙ্গন করার মানে কী? যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্ক নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করার ঠিক আগমুহূর্তে আমাদের সরকার আমেরিকার সাথে এমন এক নতজানু বাণিজ্য চুক্তি করল, যা আমাদের কৃষক ও বস্ত্রশিল্পকে কার্যত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এখন আমাদের রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য "অনুমতি" দেওয়া হচ্ছে। আর কী কী করার জন্য আমাদের অনুমতি নিতে হবে? বাথরুমে যাওয়ার জন্য? কাজ থেকে একদিনের ছুটি নেওয়ার জন্য? নাকি নিজের মায়ের সাথে দেখা করার জন্য?'
ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ আমেরিকার শীর্ষ রাজনীতিকরা যখন প্রতিনিয়ত ভারতকে প্রকাশ্যে উপহাস ও হেয় করছেন, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী কেন তাদের সঙ্গে কোলাকুলিতে ব্যস্ত—সেই প্রশ্নও তুলেছেন অরুন্ধতী রায়।
গাজায় ইসরায়েলের হামলার প্রসঙ্গ টেনে লেখিকা বলেন, 'গাজায় যখন গণহত্যা চরম পর্যায়ে, তখন ভারত সরকার সেখান থেকে বিতাড়িত ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের শূন্যস্থান পূরণ করতে হাজার হাজার দরিদ্র ভারতীয়কে ইসরায়েলে পাঠিয়েছে। আজ যখন প্রাণ বাঁচাতে ইসরায়েলিরা বাঙ্কারে আশ্রয় নিচ্ছে, তখন খবর পাওয়া যাচ্ছে যে ভারতীয় শ্রমিকদের সেই আশ্রয়ের অধিকারটুকুও দেওয়া হচ্ছে না।'
অরুন্ধতী আরও বলেন, 'আমাদের বিকৃত ও বিষাক্ত সিনেমাগুলোতে সেলুলয়েডের নায়করা একের পর এক কাল্পনিক যুদ্ধে জয়লাভ করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কাণ্ডজ্ঞানহীন কিন্তু পেশিবহুল এসব চরিত্র অহেতুক সহিংসতার মাধ্যমে আমাদের রক্তপিপাসাকে উসকে দিচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'অনেকের হয়তো মনে আছে, আমরা একসময় চীনা কমিউনিস্টদের ব্যবহৃত সেই চটকদার ও অতিরঞ্জিত তকমা "সাম্রাজ্যবাদের অনুগত কুকুর" নিয়ে তামাশা করতাম। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের আমাদের অবস্থা বোঝাতে বোধহয় এরচেয়ে ভালো বিশেষণ আর নেই।'
ইরান ও লেবাননের ওপর আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ হামলাকে উসকানিমূলক ও অবৈধ বলে উল্লেখ করেন অরুন্ধতী। তিনি বলেন, 'এটা গাজায় মার্কিন-ইসরায়েলি গণহত্যারই ধারাবাহিকতা। সেই একই খুনিরা পুরনো কৌশলেই কাজ করছে। নারী ও শিশুদের হত্যা করছে। বোমা ফেলা হাসপাতালে। কার্পেট বম্বিং করে শহর গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। তারপর নিজেরাই ভুক্তভোগী সাজার ভান করছে।'
লেখিকা বলেন, ইরানকে গাজার সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে। এই যুদ্ধের আঁচ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশ্ব এখন পরমাণু বিপর্যয় ও চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি। হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ফেলা আমেরিকা আজ বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এক সভ্যতাকে ধ্বংস করতে উদ্যত।
ইরানের সরকার পরিবর্তনের প্রসঙ্গে অরুন্ধতী বলেন, 'আমেরিকা, ইসরায়েল বা ভারত—যেখানেই ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রয়োজন হোক না কেন, তা দেশের সাধারণ মানুষকেই করতে হবে। কোনো লোভী, মিথ্যাবাদী বা দাঙ্গাবাজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মদতে সেই পরিবর্তন কাম্য নয়।'